সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—নিজের বর্তমান মূল বেতন অনুযায়ী নতুন স্কেলে কত টাকা বেতন হবে, ধাপে ধাপে কত পাওয়া যাবে এবং বাড়িভাড়া-চিকিৎসা-টিফিনসহ মোট মাসিক প্রাপ্য কত দাঁড়াবে?
এই হিসাব সহজ করতে তৈরি হয়েছে অনলাইনভিত্তিক ‘বেতন নির্ধারণী ২০২৬’ ক্যালকুলেটর। ওয়েবসাইটটিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট দিলেই নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণ, ধাপে ধাপে প্রাপ্য বেতন এবং বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে সম্ভাব্য মাসিক মোট বেতন দেখা যাচ্ছে। ক্যালকুলেটরটি নিজেই উল্লেখ করেছে যে এটি সহায়ক হিসাবযন্ত্র, সরকারি দলিল নয়; চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ হিসাবরক্ষণ অফিসের বেতন নির্ধারণী বিবরণীর ওপর নির্ভর করবে।
গ্রেড ও মূল বেতন দিলেই শুরু হবে হিসাব
অনলাইন ক্যালকুলেটরটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, একজন সরকারি চাকরিজীবী তার গ্রেড এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন ইনপুট করলেই নতুন বেতন কাঠামোর হিসাব শুরু করতে পারেন।
সাইটে গ্রেড নির্বাচনের পাশাপাশি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন বাছাই করার অপশন রয়েছে। নির্দিষ্ট ধাপে বেতন না থাকলে ব্যবহারকারী নিজেও মূল বেতনের অঙ্ক লিখতে পারেন।
অর্থাৎ, পুরোনো স্কেলে একজন কর্মচারী বর্তমানে যে বেসিক বেতন পাচ্ছেন, সেটি জানা থাকলেই নতুন পে-স্কেলে তার বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে—তার একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
শুধু নতুন বেসিক নয়, ধাপে ধাপে বেতনের হিসাব
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নতুন মূল বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর না হয়ে নির্ধারিত ধাপে বাস্তবায়ন করা।
প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের জন্য নতুন মূল বেতনের অতিরিক্ত অংশের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট হার আরও বাড়বে এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
ক্যালকুলেটরটিও এই ধাপভিত্তিক কাঠামো অনুসরণ করে নতুন মূল বেতন দেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। ওয়েবসাইটের বর্ণনায় বলা হয়েছে, এতে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণ এবং ধাপে ধাপে প্রাপ্য অংশ একসঙ্গে দেখানো হয়।
বাড়িভাড়াসহ মোট বেতন দেখার সুবিধা
শুধু মূল বেতন জানলেই একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত মাসিক আয় সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় না। কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হয়।
এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ক্যালকুলেটরে মাসিক বেতন ও ভাতা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সাইটের তথ্য অনুযায়ী এখানে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, টিফিন ভাতা, যাতায়াত ভাতা, মোবাইল ভাতা, শিক্ষা সহায়ক ভাতাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মস্থল এবং অন্যান্য কিছু তথ্যের ভিত্তিতেও হিসাব পরিবর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে।
যেসব তথ্য দেওয়া যায়
ক্যালকুলেটরে মূল বেতনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি অতিরিক্ত তথ্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে—
- গ্রেড
- ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন
- কর্মস্থলের ধরন
- সরকারি বাসস্থানে থাকেন কি না
- সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কর্মস্থল কি না
- বয়স ৫০ বছরের বেশি কি না
- সন্তানের সংখ্যা
- অন্যান্য ভাতা
- পে-স্লিপ অনুযায়ী বাড়িভাড়ার অঙ্ক
বিশেষ করে বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী চাইলে নিজের পে-স্লিপে থাকা অঙ্ক সরাসরি দিতে পারবেন। সেটি খালি রাখলে ক্যালকুলেটরটি ২০১৫ সালের আদেশে চলমান ভাতার হার অনুসারে হিসাব করার কথা জানিয়েছে।
একটি জায়গাতেই পাওয়া যাবে কয়েক ধাপের হিসাব
সাধারণভাবে নতুন পে-স্কেলে নিজের বেতন হিসাব করতে হলে পুরোনো বেসিক, নতুন স্কেলের ধাপ, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, টিফিন ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্য আলাদাভাবে হিসাব করতে হয়।
নতুন এই ক্যালকুলেটরের লক্ষ্য হলো সেই হিসাবকে একটি জায়গায় নিয়ে আসা।
ফলে একজন সরকারি চাকরিজীবী প্রথমে নিজের গ্রেড ও ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন দিলে নতুন স্কেলে মূল বেতন নির্ধারণের ফল দেখতে পারবেন। এরপর প্রয়োজনীয় ভাতার তথ্য যোগ করলে মাসিক মোট প্রাপ্যের একটি ধারণাও পাওয়া যাবে।
ক্যালকুলেটরে যে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, হিসাবের একটি অংশে আলাদাভাবে দেখানো হচ্ছে—
৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন → পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ → পার্থক্য → নতুন ২০২৬ স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ → ধাপে প্রাপ্য অংশ → নির্ধারিত বেতন।
এর ফলে শুধু নতুন বেতন কত হলো সেটিই নয়, কীভাবে নতুন বেতনটি নির্ধারিত হলো, সেটিও বোঝার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যাদের বর্তমান বেতন পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন নয়; বরং একাধিক ইনক্রিমেন্টের কারণে তারা স্কেলের ওপরের কোনো ধাপে অবস্থান করছেন।
বার্ষিক প্রাপ্যও দেখা যাবে
ক্যালকুলেটরটির আরেকটি সুবিধা হলো শুধু মাসিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাৎসরিক প্রাপ্য দেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওয়েবসাইটের কাঠামোতে ‘মাসিক বেতন ও ভাতা’ এবং ‘বাৎসরিক প্রাপ্য’—দুই ধরনের ফলাফল দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
এতে একজন চাকরিজীবী মাসিক বেতনের পাশাপাশি বছরে মোট কত টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তারও একটি প্রাথমিক হিসাব করতে পারবেন।
তবে ক্যালকুলেটরকে সরকারি পে-ফিক্সেশন হিসেবে ধরা যাবে না
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয় রয়েছে।
ওয়েবসাইটটি নিজেই জানিয়েছে, এটি সহায়ক হিসাবযন্ত্র, সরকারি দলিল নয়। চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের বেতন নির্ধারণী বিবরণীর ওপর।
অর্থাৎ, ক্যালকুলেটরে পাওয়া অঙ্ককে অফিসিয়াল পে-ফিক্সেশন, বেতন নির্ধারণী ভাউচার বা হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদিত বেতন বিবরণীর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশেষ করে পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, ব্যক্তিগত বেতন, পূর্ববর্তী পে-ফিক্সেশন, ইনক্রিমেন্টের তারিখ বা বিশেষ কোনো আর্থিক সুবিধা থাকলে বাস্তব হিসাব ক্যালকুলেটরের সাধারণ হিসাবের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে।
গেজেটের সঙ্গে মিল রেখেই হিসাবের দাবি
ক্যালকুলেটরটির ওয়েবপেজে এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের গেজেট তালিকাতেও ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬ এবং সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা নম্বরও উল্লেখ রয়েছে।
ফলে নতুন পে-স্কেলের হিসাব করতে গিয়ে অনুমাননির্ভর পুরোনো তথ্যের পরিবর্তে প্রকাশিত গেজেটের কাঠামো অনুসরণ করার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে হিসাব করবেন?
ব্যবহারকারীরা ধাপে ধাপে এভাবে হিসাব করতে পারবেন—
প্রথম ধাপ:
অনলাইন ‘বেতন নির্ধারণী ২০২৬’ পেজে প্রবেশ করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ:
নিজের বর্তমান গ্রেড নির্বাচন করতে হবে।
তৃতীয় ধাপ:
৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে মূল বেতন ছিল সেটি নির্বাচন বা লিখতে হবে।
চতুর্থ ধাপ:
প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মস্থল, সরকারি বাসস্থান, সিটি কর্পোরেশন এলাকা, সন্তান সংখ্যা ও অন্যান্য তথ্য দিতে হবে।
পঞ্চম ধাপ:
বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে পে-স্লিপের প্রকৃত অঙ্ক থাকলে সেটি দেওয়া যেতে পারে।
ষষ্ঠ ধাপ:
এরপর ফলাফলে নতুন মূল বেতন, ধাপভিত্তিক বেতন, বিভিন্ন ভাতা এবং মোট মাসিক প্রাপ্য দেখা যাবে।
নতুন পে-স্কেলে চাকরিজীবীদের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সরকার নতুন বেতন ও ভাতার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে নতুন বেতন কাঠামোকে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে ব্যক্তিভিত্তিক বেতন হিসাব।
একই গ্রেডের দুজন চাকরিজীবীর মূল বেতন যদি এক না হয়, তাহলে নতুন পে-স্কেলেও তাদের চূড়ান্ত বেতন একই হবে না। আবার কর্মস্থল, বাড়িভাড়া, সন্তানসংখ্যা, সরকারি বাসস্থান বা অন্যান্য প্রাপ্যতার পার্থক্য থাকলেও মোট বেতনে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
এই কারণে শুধু ‘কোন গ্রেডে কত বেতন’ জানার পরিবর্তে নিজের বর্তমান বেসিক থেকে নতুন বেতন কত হবে—এই হিসাবটিই এখন চাকরিজীবীদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এক নজরে
| বিষয় | ক্যালকুলেটরে সুবিধা |
|---|---|
| গ্রেড | নির্বাচন করা যায় |
| ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন | ইনপুট দেওয়া যায় |
| নতুন মূল বেতন | নির্ধারণের হিসাব দেখা যায় |
| ধাপে ধাপে বেতন | দেখা যায় |
| বাড়িভাড়া | হিসাবের সুযোগ রয়েছে |
| চিকিৎসা ভাতা | অন্তর্ভুক্ত |
| টিফিন ভাতা | অন্তর্ভুক্ত |
| যাতায়াত ভাতা | কর্মস্থলভেদে হিসাব |
| শিক্ষা সহায়ক ভাতা | সন্তানসংখ্যার ভিত্তিতে ইনপুট |
| অন্যান্য ভাতা | আলাদা করে যোগ করা যায় |
| মাসিক মোট | দেখা যায় |
| বাৎসরিক প্রাপ্য | দেখা যায় |
| সরকারি পে-ফিক্সেশনের বিকল্প? | না |

অনলাইন ক্যালকুলেটর: বেতন নির্ধারণী ২০২৬ ক্যালকুলেটর
শেষ কথা
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর বাস্তবায়ন ধাপ, নতুন মূল বেতন এবং পুরোনো হারে চলমান ভাতার সমন্বয়—সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত বেতন হিসাব অনেকের কাছেই জটিল মনে হতে পারে। সেই জায়গায় গ্রেড ও বর্তমান মূল বেতন দিয়ে দ্রুত একটি প্রাথমিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়ার এই অনলাইন ক্যালকুলেটরটি চাকরিজীবীদের জন্য ব্যবহারিক সহায়ক হতে পারে।
তবে ক্যালকুলেটরের ফলাফলকে চূড়ান্ত সরকারি বেতন নির্ধারণ হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য হিসাব হিসেবে দেখা উচিত। চূড়ান্ত বেতন, বকেয়া ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে প্রকাশিত গেজেট এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদিত পে-ফিক্সেশনই চূড়ান্ত ভিত্তি হবে।

