দেশের বাজারে বেসরকারি পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। অক্টোবর ২০২৬ মাসের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। নতুন নির্ধারিত মূল্য ৪ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। Dhaka Tribune
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ফলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। BD Bulletin
কেন বাড়ল এলপিজির দাম
বিইআরসির মূল্য সমন্বয় বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৬-এর জন্য সৌদি আরামকো ঘোষিত Saudi CP-কে ভিত্তি ধরে বেসরকারি এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এলপিজির মূল্য, জাহাজভাড়া এবং এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য ও আমদানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব এবার দেশের ভোক্তা পর্যায়ের দামে সরাসরি পড়েছে।
১২ কেজির সিলিন্ডারে হিসাব
আগের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১,৫৮৫ টাকা। নতুন মূল্য ১,৮৩৭ টাকা।
অর্থাৎ—
১,৮৩৭ – ১,৫৮৫ = ২৫২ টাকা বৃদ্ধি।
শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ১৫.৯১ শতাংশ।
এর ফলে মাসে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহারকারী পরিবারকে আগের তুলনায় প্রতি মাসে ২৫২ টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে। একই হারে দাম অপরিবর্তিত থাকলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ২৪ টাকা।
বিভিন্ন সাইজের এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম
বিইআরসির বিজ্ঞপ্তিতে শুধু ১২ কেজি নয়, বিভিন্ন ওজনের বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত দাম হলো—
| সিলিন্ডারের ওজন | নতুন মূল্য |
|---|---|
| ৫.৫ কেজি | ৮৪২ টাকা |
| ১২ কেজি | ১,৮৩৭ টাকা |
| ১২.৫ কেজি | ১,৯১৩ টাকা |
| ১৫ কেজি | ২,২৯৬ টাকা |
| ১৬ কেজি | ২,৪৪৪ টাকা |
| ১৮ কেজি | ২,৭৫৫ টাকা |
| ২০ কেজি | ৩,০৬১ টাকা |
| ২২ কেজি | ৩,৩৬৯ টাকা |
| ২৫ কেজি | ৩,৮২৭ টাকা |
| ৩০ কেজি | ৪,৫৯২ টাকা |
| ৩৩ কেজি | ৫,০৫৯ টাকা |
| ৩৫ কেজি | ৫,৩৬৯ টাকা |
| ৪৫ কেজি | ৬,৮৮৮ টাকা |
বিজ্ঞপ্তির হিসাবে, অক্টোবর মাসে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির মূল্য প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ৮ পয়সা ধরা হয়েছে। সেই হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ১,৮৩৬ টাকা ৯৬ পয়সা, যা নির্ধারণ করে ১,৮৩৭ টাকা করা হয়েছে।
অটোগ্যাসের দামও বাড়ল
রান্নার এলপিজির পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অটোগ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ের দাম প্রতি লিটার ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের দাম ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে বেড়েছে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা। The Report
ফলে এলপিজিচালিত যানবাহনের জ্বালানি ব্যয়ও বাড়বে। বিশেষ করে যেসব পরিবহন নিয়মিত অটোগ্যাস ব্যবহার করে, তাদের পরিচালন ব্যয়ের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
সেপ্টেম্বরের তুলনায় এবার বড় মূল্যবৃদ্ধি
চলতি বছর এলপিজির দামে বেশ কয়েকবার ওঠানামা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগে আগস্টে দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা করা হয়েছিল। এরও আগে জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানোর ঘটনা ঘটেছিল। Sangbad
ফলে সেপ্টেম্বরের সামান্য মূল্যহ্রাসের পর অক্টোবরেই ২৫২ টাকা বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের ওপর নতুন করে বড় চাপ তৈরি হলো।
বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ
নতুন মূল্য ঘোষণার আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সরবরাহ ও বাজারদর নিয়ে অস্থিরতার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকা দামের ১২ কেজির সিলিন্ডার অনেক জায়গায় এর চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। কিছু এলাকায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। দৈনিক আমার দেশ
আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন দাম ঘোষণার আগে বাজারের কিছু অংশে ১২ কেজির সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ ছিল। অর্থাৎ বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার নতুন দামের তুলনাতেও বাজারদর বেশি হলে ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হতে পারে। BD Bulletin
সরবরাহ সংকট নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এলপিজির দাম বৃদ্ধির সময় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় সিলিন্ডার সহজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রত্যাশায় সরবরাহ কমিয়ে রাখার অভিযোগও ছিল। দৈনিক আমার দেশ
এখানেই নতুন দামের কার্যকারিতা নিয়ে ভোক্তাদের মূল প্রশ্ন—বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাবে কি না।
কারণ শুধু মূল্য নির্ধারণ করলেই বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় না। সরবরাহ, ডিলার পর্যায়ের বিক্রয়, পরিবহন ব্যয় এবং খুচরা বাজারে নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
পরিবারের মাসিক বাজেটে কতটা প্রভাব পড়বে
এলপিজি এখন শহর ও মফস্বলের বিপুলসংখ্যক পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানির একটি। ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বৃদ্ধি সরাসরি পারিবারিক বাজেটে প্রভাব ফেলবে।
যে পরিবার মাসে একটি সিলিন্ডার ব্যবহার করে, তাদের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৪ টাকা। আর মাসে দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ৬ হাজার ৪৮ টাকা—যদি পুরো বছর একই দাম বহাল থাকে।
শুধু বাসাবাড়িই নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, বেকারি ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায় এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ের ওপরও চাপ পড়তে পারে। এর প্রভাব পরোক্ষভাবে কিছু পণ্য ও সেবার দামেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন ভোক্তাদের করণীয় কী
নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর ভোক্তাদের নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে মিলিয়ে সিলিন্ডার কেনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ১২ কেজির সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে বিইআরসি নির্ধারিত নতুন মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা—এই বিষয়টি মনে রাখা জরুরি।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন বা অন্য কোনো অনুমোদিত খরচ প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দাম নেওয়া হলে ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে।
এক নজরে নতুন দাম
- ১২ কেজি এলপিজি: ১,৮৩৭ টাকা
- আগের দাম: ১,৫৮৫ টাকা
- বৃদ্ধি: ২৫২ টাকা
- মূল্যবৃদ্ধির হার: প্রায় ১৫.৯ শতাংশ
- প্রতি কেজি: ১৫৩ টাকা ৮ পয়সা
- অটোগ্যাস: ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা/লিটার
- কার্যকর: ৪ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টা থেকে
সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসে এলপিজির নতুন মূল্য সাধারণ ভোক্তার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ব্যয়বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও আমদানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে বিইআরসি দাম বাড়ালেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্ধারিত মূল্যে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বন্ধ করা। কারণ ১ হাজার ৮৩৭ টাকা সরকারি নির্ধারিত মূল্য হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হলে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

