আজকের খবর ২০২৬

জমি কেনার আগে সাবধান: নকল বা জাল দলিল চেনার সহজ ও কার্যকর উপায়

সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে এক টুকরো জমি বা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কিন্তু সামান্য অসতর্কতার কারণে সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে যদি দলিলটি নকল বা জাল হয়। বর্তমানে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের একটি বড় অংশের মূল কারণ এই জাল দলিল। তবে কিছু সাধারণ সতর্কতা এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই আসল ও নকল দলিলের পার্থক্য ধরা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ এবং ভূমি আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, নকল দলিল চেনার জন্য কয়েকটি ধাপে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। নিচে জাল দলিল শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলো তুলে ধরা হলো:

১. কাগজ ও কালির ধরণ পরীক্ষা পুরানো দলিলের সত্যতা যাচাইয়ে কাগজের মান একটি বড় নির্দেশক। পুরোনো আমলের দলিল সাধারণত হাতে তৈরি বা মোটা কাগজে লেখা হতো। যদি কোনো বহু পুরোনো তারিখের দলিল অত্যাধুনিক মসৃণ প্রিন্টিং পেপারে বা ঝকঝকে সাদা কাগজে দেখা যায়, তবে সেটি সন্দেহের উদ্রেক করে। এছাড়া, পুরোনো দলিলে ফাউন্টেন পেন বা পুরোনো টাইপরাইটারের ফন্ট থাকার কথা। সেখানে আধুনিক কম্পিউটার ফন্টের ব্যবহার থাকলে দলিলটি জাল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। পাশাপাশি সরকারি সিলমোহর বা রেজিস্ট্রেশন সিলের রঙ এবং স্পষ্টতা যাচাই করতে হবে।

২. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেকর্ড যাচাই দলিল আসল না নকল—তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নেওয়া। যে অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি হওয়ার কথা, সেখানে দলিলের নম্বর, তারিখ এবং ভলিউম নম্বর দিয়ে ‘নকলের আবেদন’ (Certified Copy) করতে হবে। যদি অফিসের ভলিউম বা ইনডেক্স বুকে দলিলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় এবং অফিস থেকে আপনাকে নকল সরবরাহ করা হয়, তবে দলিলটি সঠিক। অন্যথায়, রেকর্ড না থাকলে দলিলটি নিশ্চিতভাবেই জাল।

৩. মালিকানার ধারাবাহিকতা ও তথ্যের মিল দলিলে উল্লিখিত দাতা বা বিক্রেতার তথ্যের সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) মিল থাকা জরুরি। বিশেষ করে জমির তফসিল, দাগ নম্বর, খতিয়ান এবং চৌহদ্দি (সীমানা) বাস্তবে মিল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া বিক্রেতা জমিটি কীভাবে পেলেন, অর্থাৎ ‘মালিকানার চেইন’ বা ভায়া দলিল যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাল দলিলে প্রায়ই এই পূর্ববর্তী মালিকানার তথ্যে গরমিল থাকে বা চেইন ভাঙা থাকে।

৪. স্বাক্ষর ও টিপসই পরীক্ষা দলিলের দাতার স্বাক্ষর এবং টিপসই আসল কি না, তা যাচাই করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বর্তমান স্বাক্ষরের সঙ্গে দলিলের স্বাক্ষরের বড় কোনো অমিল থাকলে অভিজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া উচিত। টিপসই বা আঙুলের ছাপ সাধারণত পরিবর্তন হয় না, তাই সন্দেহ হলে টিপসই বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে তা যাচাই করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ভূমি ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমি রেজিস্ট্রেশন বা বায়না করার আগে কেবল দলিলের ওপর নির্ভর না করে সরেজমিনে ভূমি অফিস থেকে তথ্য যাচাই করা উচিত। স্ট্যাম্প শুল্ক সঠিক সময়ে কেনা হয়েছে কি না এবং ভেন্ডারের তথ্য সঠিক কি না—তাও দেখা জরুরি। দলিলের সত্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ভূমি নথিপত্র বিশ্লেষকের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।

সামান্য একটু সচেতনতা এবং সঠিক যাচাই-বাছাই আপনাকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচাতে পারে।

দলিল অনলাইন শুরু হবে কবে?

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে পুরোদমে অনলাইন দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের ঘোষণা ও গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. কার্যকর হওয়ার তারিখ: নতুন নিয়ম অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে দলিল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক হওয়ার কথা রয়েছে।

২. বর্তমান প্রস্তুতি: এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমানে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে ১৯০৮ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংরক্ষিত পুরোনো দলিলগুলো স্ক্যান করে ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষণ (আর্কাইভিং) করার কাজ চলছে।

৩. উদ্দেশ্য: এই ব্যবস্থা চালু হলে ঘরে বসেই দলিলের আবেদন করা যাবে এবং রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অনলাইনে দলিল সংগ্রহ করা যাবে। এতে দালালের দৌরাত্ম্য কমবে এবং জালিয়াতি রোধ করা সহজ হবে।

উল্লেখ্য: যদিও পূর্ণাঙ্গ অনলাইন দলিল রেজিস্ট্রেশন ২০২৬ সালে শুরু হবে, কিন্তু ভূমি সংক্রান্ত অন্যান্য সেবা যেমন— ই-নামজারি (e-Mutation), ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax) প্রদান এবং খতিয়ান বা পর্চা (ROR) তোলার সুবিধা এখনই অনলাইনে land.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।

আপনি যদি এখনই কোনো জমির দলিল বা রেকর্ড যাচাই করতে চান, তবে বর্তমানে চালু থাকা অনলাইন সেবাগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *