সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রয় কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ নতুন ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ ২০২৬’ জারি করেছে । ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি অফিস স্মারক জারি করা হয় ।
আদেশের পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা: বিগত ১৬ আগস্ট ২০১৫ সালে সর্বশেষ আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ জারি করা হয়েছিল । তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় এবং সম্প্রতি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ প্রণয়ন ও সরকারি প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসায় এই আদেশটি হালনাগাদ করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে । এছাড়া নতুন ‘বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টটিং ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম’ (BACS) অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক স্তর ও অর্থনৈতিক কোডগুলো আগের মডেলে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যা এই নতুন আদেশে যুক্ত করা হয়েছে ।
নতুন আদেশের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ: ১. প্রাতিষ্ঠানিক স্তর বিন্যাস: নতুন আদেশে মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মোট ৪টি প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে আর্থিক ক্ষমতা বণ্টন করা হয়েছে ।
২. ক্রয় অনুমোদন ক্ষমতা: মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোকে অধিকতর ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এখন থেকে মন্ত্রণালয়গুলো কার্য (Works) ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ক্ষেত্রে ১০০ কোটি টাকা, পণ্য বা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ৫০ কোটি টাকা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সেবার ক্ষেত্রে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিতে পারবে ।
৩. বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা: সংযুক্ত দপ্তর প্রধান, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও নির্দিষ্ট সীমায় ক্রয় ও ব্যয় অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ।
৪. হিসাব রক্ষণ ও জবাবদিহিতা: মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিবগণ ‘প্রধান হিসাবদানকারী কর্মকর্তা’ (Principal Accounting Officer) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবেন ।
অর্থ বিভাগের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ: প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়গুলোকে ক্ষমতা দেওয়া হলেও কিছু বিশেষ বিষয় এখনও অর্থ বিভাগের অনুমোদনের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
নতুন পদ সৃজন বা স্থায়ী পদ বিলুপ্তকরণ ।
যানবাহন ক্রয় বা প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব ।
বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব ।
আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের অনুমোদন ।
বিদেশ ভ্রমণে অতিরিক্ত আপ্যায়ন ব্যয় মঞ্জুরি ।
অনুশাসন ও সতর্কতা: আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে এমন সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যা একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তার নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে করে থাকেন । অর্থ বিভাগের পূর্ব অনুমতি ছাড়া কোনো অবস্থাতেই সম্পূরক মঞ্জুরির প্রত্যাশায় অর্থ ব্যয় করা যাবে না ।
এই নতুন আদেশ জারির ফলে সরকারি কেনাকাটা ও উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আসবে এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে । এটি জারির তারিখ থেকেই কার্যকর হবে ।

সরকারি ক্রয় ক্ষমতা কতটা বৃদ্ধি করা হয়েছে?
আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ ২০২৬ অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে আগের তুলনায় অধিকতর আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। নতুন এই আদেশে বিভিন্ন স্তরে ক্রয় অনুমোদনের সীমা নিম্নরূপ নির্ধারণ করা হয়েছে:
কার্য (Works) ক্রয়: মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো এখন প্রতি ক্ষেত্রে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করতে পারবে।
পণ্য ও যন্ত্রপাতি ক্রয়: পণ্য, যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদনের সীমা প্রতি ক্ষেত্রে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা: পরামর্শক বা পেশাগত সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলো ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিতে পারবে।
ভৌত সেবা: ক্যাটারিং, নিরাপত্তা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো ভৌত সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর অনুমোদনের সীমা প্রতি ক্ষেত্রে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত।
অন্যান্য স্তরে অর্পিত ক্ষমতা: মন্ত্রণালয় ছাড়াও অন্যান্য প্রশাসনিক স্তরেও নির্দিষ্ট সীমায় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে:
সংযুক্ত দপ্তর প্রধান: কার্যের ক্ষেত্রে ৫ কোটি, পণ্যের ক্ষেত্রে ২ কোটি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সেবার ক্ষেত্রে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত।
বিভাগীয় বা আঞ্চলিক অফিস: কার্যের ক্ষেত্রে ১ কোটি এবং পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
জেলা ও উপজেলা অফিস: জেলা পর্যায়ে কার্যের জন্য ৫০ লক্ষ এবং পণ্যের জন্য ৩০ লক্ষ টাকা; তবে উপজেলা পর্যায়ে কার্যের জন্য ২০ লক্ষ এবং পণ্যের জন্য ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, কার্যের ক্ষেত্রে ১০০ কোটি, পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ কোটি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সেবার ক্ষেত্রে ২০ কোটি টাকার বেশি হলে তা সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া, নতুন এই কাঠামোতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমকে আধুনিক করতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫’ অনুসরণ করা হয়েছে।
