আজকের খবর ২০২৬

কন্যাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত না করার আহ্বান, প্রবীণদের সম্পত্তি সুরক্ষায় ‘ইউসুফরাক্ট’ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কন্যাসন্তানের প্রাপ্য সম্পত্তি নিশ্চিত করা এবং প্রবীণ বাবা-মায়ের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে শর্তযুক্ত দান বা ‘ইউসুফরাক্ট’ ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক ও প্রবীণদের আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা, মামলার জট কমাতে মধ্যস্থতা বা ‘মিডিয়েশন’ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

‘উত্তরাধিকার আইন ও প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক অবমুক্তকরণ অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার আইনে নারীর অধিকার, প্রবীণ নাগরিকদের সম্পদের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কন্যাসন্তানের সম্পত্তির অংশ সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। পারিবারিক চাপ, সামাজিক রীতি, আইনি অজ্ঞতা এবং সচেতনতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে কন্যারা পৈতৃক সম্পত্তির অংশ বুঝে পান না। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, উত্তরাধিকার আইনে নারীর যে অধিকার রয়েছে, তা কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং আইনস্বীকৃত অধিকার। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের উচিত কন্যা ও বোনদের প্রাপ্য সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া। কাউকে তার আইনগত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা সামাজিক অবিচারের পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ ও দীর্ঘমেয়াদি মামলার অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্রবীণ বাবা-মায়ের সম্পত্তি সন্তানদের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘ইউসুফরাক্ট’ বা সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে মালিকানা হস্তান্তরের আইনি ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

এ ব্যবস্থায় বাবা-মা তাদের সম্পত্তির মালিকানা সন্তানদের কাছে হস্তান্তর করলেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার, বসবাস কিংবা সম্পত্তি থেকে আয় গ্রহণের অধিকার নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করতে পারেন। ফলে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর সন্তানদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে এবং প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা বজায় থাকে।

আইনমন্ত্রী বলেন, অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অবহেলা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক বিরোধের মুখে পড়েন। সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পর নিজেদের ভরণপোষণ ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক প্রবীণ অসহায় হয়ে পড়েন। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি সুরক্ষা এবং শর্ত সংযুক্ত করার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে।

শর্তযুক্ত দান বা ‘ইউসুফরাক্ট’ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলে প্রবীণ ব্যক্তিরা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখল নিজেদের কাছে রেখে ভবিষ্যৎ মালিকানা সন্তানদের দিতে পারবেন। এতে একদিকে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তরের পরিকল্পনা সহজ হবে, অন্যদিকে বাবা-মায়ের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাও সুরক্ষিত থাকবে।

অনুষ্ঠানে প্রবীণ ও সাধারণ নাগরিকদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করা হয়। অর্থের অভাবে কোনো নাগরিক যেন আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যে সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের অসচ্ছল, সুবিধাবঞ্চিত ও বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে আইনি সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকারের আইনগত সহায়তা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, নারী, শিশু এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারি লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার সুযোগ আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

দেশের আদালতগুলোতে মামলার জট কমাতে ‘মিডিয়েশন’ বা আপস-নিষ্পত্তির ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়। সব বিরোধ আদালতের দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি না করে উপযুক্ত ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি আদালতের ওপর মামলার চাপও কমবে।

পারিবারিক, সম্পত্তি ও অন্যান্য দেওয়ানি বিরোধে মধ্যস্থতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, বিরোধের পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে পারলে সামাজিক সম্পর্ক বজায় থাকে এবং দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনার প্রয়োজন হয় না। এ কারণে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং এসব মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়েও অনুষ্ঠানে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব হলে ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ বাড়ে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত হয় না। আইনের বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সেবা সহজলভ্য করা এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এবং প্রবীণদের সম্পত্তি ও ভরণপোষণের নিরাপত্তার বিষয়ে পরিবার ও সমাজে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে বাবা-মায়ের উচিত অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া এবং দলিলে নিজেদের বসবাস, ভোগদখল ও আয় গ্রহণের অধিকার সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করা। এতে ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধ এবং প্রবীণদের অসহায় হয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সামগ্রিকভাবে অনুষ্ঠানে উত্তরাধিকার আইনে কন্যাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রবীণদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলার জট কমানো এবং নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের মধ্যে আইনি সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হলে একদিকে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও মামলা কমবে, অন্যদিকে প্রবীণ, নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *