“জমি তো আমি ভোগ করছি, চাষাবাদ করছি কিংবা বসতভিটা বানিয়ে বছরের পর বছর ধরে দখলে আছি—তাহলে রেকর্ড তো আমার নামেই হবে।”—ভূমি মালিকদের মধ্যে প্রচলিত এই ধারণাটি বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে বা বিডিএস (BDS) জরিপের ক্ষেত্রে একটি মস্ত বড় ভুল বোঝাবুঝি। দেশে চলমান আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই ডিজিটাল জরিপে শুধু ভোগদখল দেখেই কারো নামে জমির মালিকানার রেকর্ড বা খতিয়ান তৈরি করা হয় না।
সম্প্রতি বিডিএস জরিপ নিয়ে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করতে ভূমি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র এই জরিপের রেকর্ড প্রস্তুতের প্রকৃত আইনি ভিত্তি ও নিয়মাবলী স্পষ্ট করেছেন।
রেকর্ড প্রস্তুতের ৩টি মূল হাতিয়ার
বিডিএস জরিপে যখন কোনো জমির রেকর্ড বা খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়, তখন মূলত তিনটি বিষয় একসাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়:
১. রেজিস্ট্রার্ড দলিল (Registered Deed): জমির বৈধ ক্রয়ের বা হস্তান্তরের রেজিস্ট্রিকৃত প্রমাণ।
২. স্বত্বের ধারাবাহিকতা (Chain of Title): সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ান থেকে শুরু করে বর্তমান মালিক পর্যন্ত মালিকানার ধারাবাহিক যোগসূত্র।
৩. ভোগদখল (Possession): বর্তমানে জমিতে কার ভৌত উপস্থিতি বা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
শুধু ভোগদখল কি মালিকানা তৈরি করে?
ভূমি আইনের বাস্তবতায় ভোগদখল একা কখনোই পূর্ণাঙ্গ মালিকানা তৈরি করতে পারে না। জরিপের নিয়ম অনুযায়ী, মাঠে প্রথমে দেখা হয় রেজিস্ট্রেড দলিল ও স্বত্বের ধারাবাহিকতা, আর সবশেষে বিবেচনা করা হয় ভোগদখলকে।
আপনি যদি কোনো জমি দীর্ঘদিন ধরে ভোগও করেন, কিন্তু সেই জমির বৈধ রেজিস্ট্রেড দলিল যদি অন্য কোনো ব্যক্তির নামে থাকে এবং সেই দলিল যদি আদালত কর্তৃক বাতিল না হয়ে থাকে কিংবা আপনার পক্ষে আদালতের কোনো ডিক্রি না থাকে—তবে বিডিএস জরিপে দলিলধারী ব্যক্তির নামেই রেকর্ড হবে। এই ক্ষেত্রে আপনার বর্তমান ভোগদখল বিবেচনা করে বড়জোর খতিয়ানের ‘মন্তব্য কলামে’ একটি নোট বা মন্তব্য লেখা থাকতে পারে, কিন্তু আপনাকে মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
‘বহু বছর দখলে থাকলেই স্বত্ব হয়’—ধারণাটি ভুল
অনেকের ধারণা, বছরের পর বছর কোনো জমি দখলে রাখলেই বুঝি স্বত্ব বা মালিকানা তৈরি হয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। দখল কেবল তখনই স্বত্বে বা চূড়ান্ত মালিকানায় পরিণত হয়, যখন দেশের কোনো দেওয়ানি আদালত থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ডিক্রি লাভ করা যায়। আদালতের সুনির্দিষ্ট ডিক্রি বা রায় ছাড়া শুধুমাত্র দখলের জোরে বিডিএস জরিপে নাম উঠানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
দলিল অন্যের নামে কিন্তু ডিক্রি আপনার?
এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। যদি জমির দলিল অন্য কারও নামে থাকে, কিন্তু আপনি আদালত থেকে জমির স্বত্ব ঘোষণা (Title Declaration) বা দখল স্বীকৃতির পক্ষে একটি চূড়ান্ত রায় বা ডিক্রি পেয়ে থাকেন—তাহলে সেই ডিক্রির ভিত্তিতেই বিডিএস জরিপে আপনার নাম রেকর্ডভুক্ত হবে। এক্ষেত্রে দলিলের চেয়ে আদালতের ডিক্রিই প্রাধান্য পাবে।
মামলা চলমান থাকলে কী হবে?
যেসব জমির মালিকানা বা স্বত্ব নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিডিএস জরিপে সাধারণত বর্তমান বৈধ দলিলধারী ব্যক্তির নামেই সাময়িকভাবে রেকর্ড করা হয়। তবে জরিপ দল চূড়ান্ত খতিয়ানের মন্তব্য কলামে সুনির্দিষ্টভাবে লিখে দেয়—
“স্বত্ব সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন।”
ভুল ধারণায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ
মাঠপর্যায়ে এই আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জরিপের সময় ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকে মনে করছেন দখলই সব, ফলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ না করার কারণে পরবর্তীতে আইনি জটিলতায় পড়ছেন। তাই নিজের জমির মালিকানা সুরক্ষিত রাখতে এবং ভবিষ্যতের আইনি ঝামেলা এড়াতে বিডিএস জরিপ শুরু হওয়ার আগেই রেজিস্ট্রেড দলিল, নামজারি খতিয়ান ও হালনাগাদ খাজনার দাখিলা প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
