আজকের খবর ২০২৬

মৃত পুত্রের দুই কন্যাও পেল উত্তরাধিকার! ৪৪ শতাংশ জমির বণ্টনে কী বলছে মুসলিম আইন?

পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে গ্রামাঞ্চল থেকে শহর—সবখানেই প্রায়শই দেখা যায় বিভ্রান্তি ও বিরোধ। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর ছেলে বা মেয়ে পরবর্তীতে মারা গেলে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সম্প্রতি এমনই একটি বাস্তবধর্মী পরিস্থিতি নিয়ে উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে ৪৪ শতাংশ জমি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—মৃত পুত্রের দুই কন্যা কি দাদার সম্পত্তিতে কোনো অংশ পাবে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে সম্পত্তি বণ্টনের সময় মৃত্যুর ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে আগে মারা গেছেন এবং কে পরে মারা গেছেন—এই তথ্যই নির্ধারণ করে দেয় উত্তরাধিকারীদের অধিকার।

ঘটনাপ্রবাহ

তথ্য অনুযায়ী, এক ব্যক্তি ৪৪ শতাংশ জমি রেখে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে জীবিত ছিলেন—

  • স্ত্রী (১ জন)
  • পুত্র (৩ জন)
  • কন্যা (২ জন)

পরে তিন পুত্রের মধ্যে একজন মারা যান। ওই মৃত পুত্রের কোনো ছেলে সন্তান ছিল না, তবে দুই কন্যা সন্তান ছিল। তাঁর স্ত্রীও পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অন্যদিকে তাঁর মা তখনও জীবিত ছিলেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, মৃত পুত্রের দুই কন্যা কি কোনো সম্পত্তি পাবে?

প্রথম ধাপে দাদার সম্পত্তির বণ্টন

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সন্তান থাকলে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পান।

৪৪ শতাংশ জমির মধ্যে স্ত্রী পান ৫.৫০ শতাংশ জমি।

অবশিষ্ট ৩৮.৫০ শতাংশ জমি তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বণ্টিত হয়। এখানে ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়। ফলে—

  • প্রতিটি ছেলে পায় ৯.৬২৫ শতাংশ
  • প্রতিটি মেয়ে পায় ৪.৮১২৫ শতাংশ

অর্থাৎ পরবর্তীতে মৃত্যুবরণকারী পুত্রও বাবার মৃত্যুর সময় ৯.৬২৫ শতাংশ জমির বৈধ মালিক হয়ে যান।

দ্বিতীয় ধাপে মৃত পুত্রের অংশের বণ্টন

পরবর্তীতে ওই পুত্র মারা গেলে তাঁর ৯.৬২৫ শতাংশ জমি নতুন করে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়।

তাঁর উত্তরাধিকারী ছিলেন—

  • মা
  • দুই কন্যা

এ ক্ষেত্রে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মা পান ১/৬ অংশ।

ফলে ৯.৬২৫ শতাংশের মধ্যে মা পান ১.৬০৪২ শতাংশ।

অবশিষ্ট ৮.০২০৮ শতাংশ দুই কন্যার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়।

ফলে প্রতিটি কন্যা পায় ৪.০১০৪ শতাংশ জমি।

চূড়ান্ত বণ্টন

সব হিসাব শেষে ৪৪ শতাংশ জমির চূড়ান্ত বণ্টন দাঁড়ায়—

উত্তরাধিকারীপ্রাপ্য অংশ (শতাংশ)
মা৭.১০৪২
ছেলে-১৯.৬২৫০
ছেলে-২৯.৬২৫০
মেয়ে-১৪.৮১২৫
মেয়ে-২৪.৮১২৫
নাতনি-১৪.০১০৪
নাতনি-২৪.০১০৪

কেন নাতনিরা অংশ পেল?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পুত্র তাঁর বাবার আগেই মারা যেতেন, তাহলে জীবিত পুত্রদের উপস্থিতিতে নাতনিরা সাধারণত দাদার সম্পত্তিতে অংশ পেত না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পুত্রটি বাবার মৃত্যুর সময় জীবিত ছিলেন এবং নিজ নামে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির অংশ অর্জন করেছিলেন।

পরে তিনি মারা যাওয়ায় তাঁর প্রাপ্ত অংশ তাঁর নিজস্ব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়েছে। ফলে দুই কন্যা তাঁদের বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে বৈধ অংশ পেয়েছে।

সচেতনতার অভাবে বাড়ছে বিরোধ

ভূমি ও উত্তরাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে অধিকাংশ বিরোধের মূল কারণ হলো উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং যথাসময়ে বণ্টননামা না করা। অনেক পরিবারে বছরের পর বছর সম্পত্তি অবিভক্ত অবস্থায় থাকায় পরবর্তীতে একাধিক প্রজন্মের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়।

তাই উত্তরাধিকারী নির্ধারণ, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আইন অনুযায়ী দ্রুত বণ্টননামা সম্পাদন ও নিবন্ধন করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপসংহার

উল্লেখিত ঘটনায় মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুসারে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, দুই জীবিত ছেলে, দুই কন্যা এবং পরবর্তীতে মৃত পুত্রের দুই কন্যা—সকলেই নির্ধারিত অংশের অধিকারী হয়েছেন। বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর সময় জীবিত থাকা পুত্রের পরবর্তীকালের মৃত্যুর কারণে তাঁর দুই কন্যাও শেষ পর্যন্ত সম্পত্তির বৈধ অংশ পেয়েছেন, যা অনেকের কাছে উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বণ্টননামা দলিল (নমুনা)

বণ্টননামা দলিল

এই বণ্টননামা দলিল আজ ………. তারিখে নিম্নবর্ণিত পক্ষগণের মধ্যে সম্পাদিত হইল।

পক্ষগণ

১ম পক্ষ: জনাব/মোছাঃ ……………………………., স্বামী/স্ত্রী মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (মা)

২য় পক্ষ: জনাব ……………………………., পিতা মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (পুত্র)

৩য় পক্ষ: জনাব ……………………………., পিতা মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (পুত্র)

৪র্থ পক্ষ: মোছাঃ ……………………………., পিতা মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (কন্যা)

৫ম পক্ষ: মোছাঃ ……………………………., পিতা মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (কন্যা)

৬ষ্ঠ পক্ষ: মোছাঃ ……………………………., পিতা মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (নাতনি)

৭ম পক্ষ: মোছাঃ ……………………………., পিতা মৃত ……………………………., ঠিকানা: ……………………………. (নাতনি)


যেহেতু

মৃত ……………………………., পিতা ……………………………., ঠিকানা ……………………………., মৃত্যুকালে মোট ৪৪ (চুয়াল্লিশ) শতাংশ জমি রেখে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি তাঁর স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাগণের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তায়।

পরবর্তীতে মৃতের এক পুত্র ……………………………. মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুকালে উত্তরাধিকারী হিসেবে জীবিত ছিলেন তাঁর মা এবং দুই কন্যা। ফলে তাঁর প্রাপ্য অংশও মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টিত হয়।

অতএব, সকল উত্তরাধিকারী পারস্পরিক সম্মতিতে নিম্নরূপভাবে সম্পত্তি বণ্টন করিলেন।


সম্পত্তির বিবরণ

মৌজা: …………………………….

জে.এল. নং: ……………………..

খতিয়ান নং: ……………………..

দাগ নং: ……………………..

জমির পরিমাণ: ৪৪ (চুয়াল্লিশ) শতাংশ


বণ্টনের বিবরণ

ক্রমিকউত্তরাধিকারীর নামপ্রাপ্য অংশ (শতাংশ)
মা …………………………….৭.১০৪২
পুত্র …………………………….৯.৬২৫০
পুত্র …………………………….৯.৬২৫০
কন্যা …………………………….৪.৮১২৫
কন্যা …………………………….৪.৮১২৫
নাতনি …………………………….৪.০১০৪
নাতনি …………………………….৪.০১০৪
মোট৪৪.০০০০

অঙ্গীকার

১। উপরোক্ত বণ্টন মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুসারে সম্পন্ন করা হইল।

২। প্রত্যেক পক্ষ নিজ নিজ প্রাপ্য অংশ বুঝিয়া পাইয়াছেন এবং ভবিষ্যতে উক্ত সম্পত্তি সম্পর্কে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো দাবি, আপত্তি বা মামলা করিবেন না।

৩। এই বণ্টননামা দলিলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে নামজারি, খারিজ, রেকর্ড সংশোধন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাইবে।

৪। সকল পক্ষ সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় এই বণ্টননামা সম্পাদন করিলেন।


সাক্ষীগণ

সাক্ষী-১

নাম: ………………………………….

পিতা: ………………………………….

ঠিকানা: ………………………………….

স্বাক্ষর: ………………………………….

সাক্ষী-২

নাম: ………………………………….

পিতা: ………………………………….

ঠিকানা: ………………………………….

স্বাক্ষর: ………………………………….


পক্ষগণের স্বাক্ষর

১ম পক্ষ: ………………………………….

২য় পক্ষ: ………………………………….

৩য় পক্ষ: ………………………………….

৪র্থ পক্ষ: ………………………………….

৫ম পক্ষ: ………………………………….

৬ষ্ঠ পক্ষ: ………………………………….

৭ম পক্ষ: ………………………………….


নোট: এটি একটি নমুনা বণ্টননামা। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধনের জন্য প্রকৃত খতিয়ান, দাগ, মৌজা, ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ এবং অন্যান্য কাগজপত্র অনুযায়ী একজন দলিল লেখক বা আইনজীবীর মাধ্যমে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *