দেশের অর্থনীতিতে গত এক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল ঘোষণার পর কেটে গেছে দীর্ঘ এক দশক। সাধারণত প্রতি ৫ বছর পর পর নতুন পে স্কেল ঘোষণার একটি অলিখিত রীতি থাকলেও, দীর্ঘ এই সময়ে ৯ম পে স্কেল আলোর মুখ দেখেনি। ফলে একদিকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে পে স্কেলের অভ্যন্তরীণ চরম বৈষম্যের কারণে বিশেষ করে ১১-২০ তম গ্রেডের কর্মচারীদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সরকারি চাকরিজীবীদের সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনেও।
২০১৫ বনাম ২০২৪-২০২৬: এক দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
বিগত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। ২০১৫ সালের সাথে বর্তমান সময়ের বাজারের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনা করলেই এই বাস্তবচিত্র ফুটে ওঠে:
| বিবরণ/পণ্য | ২০১৫ সালের মূল্য (টাকা) | বর্তমান আনুমানিক মূল্য (টাকা) |
| ইউএস ডলার রেট | ৭৭/- (+/-) | ১২১/- (+/-) |
| ২১ ক্যারেট স্বর্ণ (প্রতি ভরি) | ৪০,০০০/- (+/-) | ১,৭৬,০০০/- (+/-) |
| গরুর মাংস (প্রতি কেজি) | ৩৮০ – ৪০০/- | ৭৫০/- (+/-) |
| খাসির মাংস (প্রতি কেজি) | ৫৫০ – ৫৭০/- | ১১০০ – ১১৫০/- |
২০১৫ সালের দিকে একজন ৯ম বা ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা বা সমমানের কর্মচারী তার মূল বেতন দিয়ে ঢাকা বা এর বাইরে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারতেন এবং মাস শেষে সঞ্চয়ও করতে পারতেন। তৎকালীন সময়ে ৩ মাসের সঞ্চয় দিয়ে গ্রামীণ বা মফস্বল এলাকায় যে পরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হতো, বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় মিটিয়ে এক বছরের পুরো মূল বেতন দিয়েও সেই জমি কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
১৯৮৫ সালের পে স্কেল ও বর্তমান বৈষম্যের খতিয়ান
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালের পে স্কেলে সব গ্রেডেই প্রায় সমহারে এবং যৌক্তিকভাবে বেতন বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় ১ম ও ২য় গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ছিল ১০০%, ৯ম গ্রেডে ১২০%, এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ছিল ১২২%। অর্থাৎ, নিম্নস্তরের কর্মচারীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
অথচ, ২০১৫ সালের ৮ম পে স্কেলে তৈরি হয়েছে এক চরম বৈষম্য।
ধাপের দূরত্বে বৈষম্য: বর্তমান স্কেলের ১১-২০ তম গ্রেডে প্রতি ধাপের দূরত্বের ব্যবধান মাত্র ৪%, যেখানে ১-১০ নম্বর গ্রেডে এই ব্যবধান গড়ে ২০%।
অনুপাতের বৈষম্য: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত হওয়া উচিত ১:৪। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮,০০০ টাকা (নির্ধারিত)। অর্থাৎ এই অনুপাত প্রায় ১:১০, যা প্রতিবেশী ভারত বা পাকিস্তানের পে স্কেলেও দেখা যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালের সুপারিশকৃত পে স্কেলের কেবল সেই অংশগুলোই পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়িত হয়েছে যা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুবিধা দেয়। অন্যদিকে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের চিকিৎসা, বাড়ি ভাড়া বা যাতায়াত ভাতা বর্তমান বাজারের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ রয়ে গেছে।
উৎসবের আনন্দ থেকেও বঞ্চিত নিম্নগ্রেডের কর্মচারীরা
উৎসবে বোনাস দেওয়া হয় আনন্দের অংশীদার হতে। কিন্তু বর্তমান বাজারে উৎসব ভাতার অর্থ দিয়ে কর্মচারীরা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বা পারিবারিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না।
ধরা যাক, ১১-২০ তম গ্রেডের একজন কর্মচারী গড়ে ১২,০০০ থেকে ১৪,০০০ টাকা উৎসব ভাতা পান। বর্তমান বাজারে কোরবানির ঈদে একটি ন্যূনতম ভাগের (শেয়ার) মূল্য ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। এর অর্থ হলো, একজন কর্মচারী যদি কোরবানির ঈদে অংশ নেন, তবে তার উৎসব ভাতার পুরো টাকাই সেখানে শেষ হয়ে যায়; পরিবার-পরিজন বা সন্তানদের জন্য ঈদের নতুন কাপড় বা ভালো খাবারের কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। ফলশ্রুতিতে, হয় তাকে কোরবানি দেওয়া ত্যাগ করতে হচ্ছে, না হয় পরিবারের আনন্দ বিসর্জন দিতে হচ্ছে।
৯ম পে স্কেলে যে সকল সংস্কার এখন সময়ের দাবি
ক্ষোভ ও অসন্তোষ দূর করে একটি দক্ষ ও বৈষম্যহীন প্রশাসন গড়ে তুলতে পে-কমিশন গঠনপূর্বক দ্রুত ৯ম পে স্কেল ঘোষণা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কেবল বেতন বৃদ্ধি নয়, নতুন পে স্কেলে নিম্নোক্ত জরুরি সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি উঠেছে:
বৈষম্য দূরীকরণ ও গ্রেড হ্রাস: ১-২০ তম গ্রেডের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান কমিয়ে সমহারে বেতন বৃদ্ধি করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কাছাকাছি অনুপাত নিয়ে আসতে হবে। একই সাথে পে-কমিশনে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের প্রতিনিধি রাখতে হবে।
ইনক্রিমেন্ট নিয়মিতকরণ: যে সকল কর্মচারী ইতোমধ্যে তাদের মূল বেতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন, তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (বেতন বৃদ্ধি) নিয়মিত চালু রাখতে হবে।
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল: পূর্বের ন্যায় টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং বেতন জ্যৈষ্ঠতা পুনর্বহাল করতে হবে। ব্লক পোস্ট নিয়মিতকরণসহ যোগ্যতা অনুযায়ী ৫ বছর পর পর উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করতে হবে।
রেশন ব্যবস্থা প্রবর্তন: বাজারমূল্যের সাথে সঙ্গতি রেখে সকল ভাতা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে রেশন ব্যবস্থা বা ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
অভিন্ন নিয়োগবিধি ও পেনশন সংস্কার: সকল সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরে কাজের ধরন অনুযায়ী পদনাম ও গ্রেড পরিবর্তন করে একটি অভিন্ন নিয়োগবিধি প্রণয়ন করতে হবে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটির পরিবর্তে পেনশন প্রবর্তন এবং গ্র্যাচুইটির হার ৯০% থেকে ১০০% এ উন্নীত করতে হবে (আনুতোষিক ১ টাকার সমমান ৫০০ টাকা নির্ধারণসহ)।
উপসংহার:
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য সরকারি কর্মচারীদের মানসিক স্বস্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা যেখানে অসম্ভব হয়ে পড়েছে, সেখানে ৯ম পে স্কেল ঘোষণা কেবল সময়ের দাবিই নয়, বরং সরকারি কর্মচারীদের বেঁচে থাকার অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার অতি দ্রুত পে-কমিশন গঠন করে এই বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
