সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি একজন কর্মকর্তার কর্মস্পৃহা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে। কিন্তু খাদ্য অধিদপ্তরের ২০১০ ব্যাচের খাদ্য পরিদর্শকদের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। একই সাথে চাকরিতে যোগদান করা কর্মকর্তাদের একাংশ পদোন্নতি পেয়ে ‘উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক’ (৯ম গ্রেড) হয়েও এখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও মানসিক বৈষম্যের শিকার। অন্যদিকে, পদোন্নতি না পেয়ে একই পদে থেকে যাওয়া কর্মকর্তারা উচ্চতর গ্রেডের কল্যাণে আগামী ২০২৬ সাল নাগাদ তাদের ছাড়িয়ে চলে যাবেন ৮ম গ্রেডে।
ফলে একই ব্যাচের জুনিয়র কর্মকর্তারা বেতনে সিনিয়র হয়ে যাবেন, আর পদোন্নতি পাওয়া সিনিয়র কর্মকর্তারা ‘উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক’ হয়েও থেকে যাবেন ৯ম গ্রেডে। চাকরিসীমার শেষ সময়ে এসে এই চরম বেতন বৈষম্যকে ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা এক প্রকার ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করছেন।
বৈষম্যের মূলে যে ‘গ্রেড’ ও ‘টাইমস্কেল’ জটিলতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ সালে ১০ম গ্রেডে খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে একদল তরুণ খাদ্য অধিদপ্তরে যোগদান করেন। দীর্ঘ চাকরিসীমার একপর্যায়ে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাদের মধ্যকার কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে ৯ম গ্রেডের ‘উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক’ (UCF) হন।
বাকি খাদ্য পরিদর্শকরা পদোন্নতি না পেলেও সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেয়ে ৯ম গ্রেডে উন্নীত হন। চাকরির বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ায় আগামী ২০২৬ সালের শেষের দিকে স্বাভাবিক নিয়মেই পদোন্নতি না পাওয়া এই খাদ্য পরিদর্শকরা দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পেয়ে ৮ম গ্রেডে উন্নীত হবেন।
জটিলতার চিত্রটি এখানেই:
পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক): ৯ম গ্রেডেই স্থবির।
পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তা (খাদ্য পরিদর্শক): উচ্চতর গ্রেড পেয়ে ৮ম গ্রেড।
একই সাথে যোগদানকৃত গ্রেডেশন লিস্টে (জ্যেষ্ঠতার তালিকা) পেছনে থাকা ব্যাচমেটরা চলে যাচ্ছেন ৮ম গ্রেডের বেতন স্কেলে, আর পদোন্নতি পাওয়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা আটকে থাকছেন ৯ম গ্রেডের স্কেলে।
‘৮ম গ্রেড’ কি শুধুই প্রহসন?
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের মতে, এই ৮ম গ্রেড প্রাপ্তি কিংবা না-প্রাপ্তি তাদের জন্য এক ধরনের প্রহসন। কারণ: ১. সিনিয়রিটির সংকট: এই ৮ম গ্রেড পদোন্নতি না পাওয়া পরিদর্শকদের পদের কোনো পরিবর্তন আনবে না, ফলে তারা মূল জ্যেষ্ঠতা (Substantive Post-এর জ্যেষ্ঠতা) পাবেন না। ২. বেতন বৈষম্য: পদোন্নতিপ্রাপ্ত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকগণ ৯ম গ্রেডে থাকার কারণে তাদের মূল বেতন (Basic) এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, ৮ম গ্রেড পাওয়া জুনিয়র ব্যাচমেটদের চেয়ে কম হতে পারে।
চাকরি জীবনের উষালগ্নে যে কর্মকর্তারা অধিদপ্তরের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছেন, বার্ধক্যের শেষ সময়ে এসে তারা পেনশন ও আনুতোষিকের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অর্জিত পদোন্নতিই এখন তাদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাধানের পথ কী?
বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই জটিলতা নিরসনে গ্রেডেশন বা জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরির সুযোগ নেই। কারণ জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হয় যার যার ‘মূল পদের’ (Substantive Post) যোগদানের তারিখ ও জ্যেষ্ঠতা বিধি অনুযায়ী। তবে জাতীয় বেতন স্কেলের মারপ্যাঁচে সৃষ্ট এই অসঙ্গতি দূর করতে ৩টি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
পদোন্নতিপ্রাপ্তদের ৮ম গ্রেডে আপগ্রেডেশন: যেহেতু তাদের ব্যাচমেটরা পরিদর্শক পদেই ২০২৬ সালে ৮ম গ্রেড পাচ্ছেন, সেহেতু পদোন্নতিপ্রাপ্ত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের পদটিকে অনতিবিলম্বে ৮ম গ্রেডে উন্নীত করা যৌক্তিক।
পে-স্কেলের বিশেষ সুরক্ষা (Pay Protection): বেতন স্কেলের মারপ্যাঁচে যেন সিনিয়ররা জুনিয়রদের চেয়ে কম বেতন না পান, সেজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে ‘পে প্রটেকশন’ বা ব্যক্তিগত বেতন (Personal Pay) নির্ধারণ করা যেতে পারে।
ফিডার পদ ও পদোন্নতির জট নিরসন: উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক থেকে পরবর্তী উচ্চতর পদে দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা, যাতে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের গ্রেড বৈষম্য স্থায়ী রূপ না নেয়।
খাদ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য: এই বেতন ও গ্রেড বৈষম্যের বিষয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, “আমরা সততার সাথে কাজ করে পদোন্নতি পেয়ে যদি জুনিয়রদের চেয়ে কম স্কেলে বেতন পাই, তবে এই পদোন্নতির অর্থ কী? সরকারের উচিত দ্রুত এই নীতিগত ভুল সংশোধন করা।”
একটি দক্ষ এবং বৈষম্যহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ধরে রাখতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় দ্রুত এই “পদোন্নতি বনাম উচ্চতর গ্রেড” সংকটের স্থায়ী সমাধান করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের।
