সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘নবম জাতীয় বেতন কাঠামো’। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন এই পে স্কেল কার্যকর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সরকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে স্কেল চালুর এই খবরে দেশের ২২ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে।
গড়ে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব
নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ওপর গড়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চমক আসতে পারে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে। প্রশাসনের নীতিগত আলোচনায় ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন শতভাগ বা দ্বিগুণ বৃদ্ধির বিষয়টি জোরালোভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| গ্রেড | বর্তমান মূল বেতন (টাকা) | প্রস্তাবিত মূল বেতন (৫০% বৃদ্ধিতে) | প্রস্তাবিত মূল বেতন (১০০% বৃদ্ধিতে – আলোচনাধীন) |
| ১ম গ্রেড | ৭৮,০০০ (নির্ধারিত) | ১,১৭,০০০ | — |
| ২য় গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ১,১৪,৭৩৫ | — | — |
| ৩য় গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ১,১১,৬০০ | — | — |
| ১০ম গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ৩৮,৬৪০ | ৫৭,৯৬০ | — |
| ১১তম গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ৩০,২৩০ | ৪৫,৩৪৫ | ৬০,৪৬০ |
| ২০তম গ্রেড (সর্বনিম্ন) | ৮,২৫০ | ১২,৩৭৫ | ১৬,৫০০ |
| ২০তম গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ২০,০১০ | ৩০,০১৫ | ৪০,০২০ |
উল্লেখ্য, ৪র্থ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতনও একইভাবে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে কর্মচারী কল্যাণ সমিতির খোলা চিঠি
নতুন বেতন কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের এই ডামাডোলের মধ্যেই সরকারের কাছে নিজেদের চরম দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছে ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি’। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মালেক স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে:
“২০১৫ সালের বেতন কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের এই চরম ঊর্ধ্বমুখী বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গত ১১ বছরে দেশের বাজারে দ্রব্যমূল্য ধাপে ধাপে আকাশচুম্বী হলেও কর্মচারীদের বেতনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বহু কর্মচারী ইতোমধ্যে বেতনের শেষ ধাপে পৌঁছে যাওয়ায় তাদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টও বন্ধ হয়ে গেছে।”
ঋণের বোঝা ও পারিবারিক সংকট
খোলা চিঠিতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পারিবারিক ও সামাজিক সংকটের এক মর্মস্পর্শী বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কল্যাণ সমিতির দাবি, অধিকাংশ সাধারণ কর্মচারী বর্তমানে প্রভিডেন্ট ফান্ড কিংবা ব্যাংক ঋণের দায়ে জর্জরিত। প্রতি মাসে বেতন থেকে ঋণের কিস্তির টাকা কাটার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিনের বেশি সংসার চালানো সম্ভব হয় না।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১১ বছরে ২২টি ঈদ পার হলেও আর্থিক সংকটের কারণে অধিকাংশ সাধারণ কর্মচারী ও তাদের সন্তানরা নতুন কাপড়ের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি। কোরবানির ঈদে মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বোনাস পেয়ে বর্তমান বাজারে কোরবানির গরুর অংশীদার হওয়াও তাদের জন্য স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ফলে আত্মীয়-স্বজন ও সন্তানদের কাছে প্রতিনিয়ত তাদের মাথা নিচু করে থাকতে হচ্ছে।
দ্রুত ঘোষণার দাবি
বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার আগেই নবম পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।
কর্মচারীদের সম্মান রক্ষার্থে প্রয়োজনে মূল বেতন শতভাগ বাড়িয়ে ভাতাগুলো দুই ভাগে বিভক্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। কর্মচারীদের মতে, পে স্কেল বাস্তবায়নে যত দেরি হবে, বাজার পরিস্থিতি তত বেশি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত ঘোষণার মাধ্যমেই কেবল সরকারি কর্মচারীদের পরিবারগুলোতে প্রকৃত স্বস্তি ও ঈদের আনন্দ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
