সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসিক বেতনের ৫০% মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance) দেওয়ার যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবে কর্মচারীদের কোনো প্রকৃত সুবিধা দেবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও সরকারি কর্মচারী প্রতিনিধিরা। বরং এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে একদিকে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, অন্যদিকে বেতন বৃদ্ধির নামে কর্মচারীরা প্রকৃতপক্ষে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
৩০,০০০ কোটি টাকার হিসাব কোথায় যাচ্ছে?
সরকার এবারের বাজেটে নতুন পে-স্কেল না দিয়ে বেসিকের ৫০% মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অঙ্কটি দেখতে বড় হলেও বাস্তবে নতুন কিছু যোগ হচ্ছে না।
প্রতি অর্থবছরেই সরকার বেতন বাবদ বাজেটে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০% বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখে। এর কারণ হলো — জুলাই মাস থেকে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কার্যকর হয়, যার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন পড়ে। এর পাশাপাশি নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির কারণেও বেতন বাবদ ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।
হিসাব বলছে, নতুন পে-স্কেল না দিলেও শুধু এই নিয়মিত বৃদ্ধির কারণে সরকারকে চলতি বছরের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা বেশি রাখতেই হতো। তাহলে ৩০,০০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রকৃত নতুন বরাদ্দ মাত্র ২২,০০০ কোটি টাকার কিছু বেশি।
ইনক্রিমেন্ট ও বিশেষ সুবিধা বন্ধের বিনিময়ে কী পাচ্ছেন কর্মচারীরা?
আলোচনায় আরও উঠে এসেছে যে, এই মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার বিনিময়ে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং বিদ্যমান ১৫% বিশেষ সুবিধা (Special Benefit) বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এই দুটি সুবিধা বাতিল করলে সরকারের সাশ্রয় হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
এই সাশ্রয়কৃত অর্থের ৫০% যোগ করে যদি বেতন বাড়ানো হয়, তাহলে কর্মচারীর হাতে মাস শেষে আসলে কতটুকু বাড়তি আসবে — সে প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন কর্মচারীর বর্তমান বেসিক বেতন ২০,০০০ টাকা।
| সুবিধার ধরন | বর্তমানে প্রাপ্তি | প্রস্তাবিত পরিবর্তনে প্রাপ্তি |
|---|---|---|
| বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (৫%) | ~১,০০০ টাকা/মাস বৃদ্ধি | বন্ধ |
| ১৫% বিশেষ সুবিধা | ৩,০০০ টাকা | বন্ধ |
| মহার্ঘ ভাতা (৫০% বেসিক) | ০ | ১০,০০০ টাকা |
| নিট পরিবর্তন | — | +৬,০০০ টাকা (আপাতদৃষ্টিতে) |
কিন্তু এখানে একটি বড় ফাঁকি রয়েছে। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট না পেলে আগামী ৫ বছরে যে বেতন বৃদ্ধি হতো, তা আর হবে না। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লাভ দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি অনেক বেশি।
মূল্যস্ফীতির চাপ: বেতন বাড়লে দামও বাড়বে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি খাতে একসাথে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি ঘোষণা করা হলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ইতিহাস বলছে, ২০১৫ সালের পে-স্কেল ঘোষণার পরেও বাজারে দ্রুত মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল।
বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মহার্ঘ ভাতার নামে বাড়তি টাকা ছাড়া হলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। ফলে কর্মচারীরা বেতনে যা পাবেন, বাজারে গিয়ে তার চেয়ে বেশি খরচ হবে। প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তাই বাড়বে না — বরং কমার আশঙ্কাই বেশি।
নতুন পে-স্কেল ছাড়া সমাধান নেই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূলে রয়েছে পে-স্কেল সংস্কারের অভাব। বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন পে-স্কেল আসেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতি, ডলারের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। অথচ কর্মচারীদের মূল বেতন কাঠামো সেই পুরনো ভিত্তিতেই আটকে আছে।
মহার্ঘ ভাতা একটি সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মচারীদের প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কর্মরত কর্মচারীরা বলছেন, সরকার যদি সত্যিই কল্যাণ চাইত, তাহলে পুরনো সুবিধা বাতিল না করে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করত। ইনক্রিমেন্ট ও বিশেষ সুবিধা বন্ধ করে মহার্ঘ ভাতার নামে যা দেওয়া হচ্ছে, তা আসলে “এক হাতে দেওয়া, আরেক হাতে কেড়ে নেওয়া”র কৌশল ছাড়া কিছু নয়।
অনেকে বলছেন, এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল — কাগজে-কলমে “বেতন বাড়ানো হয়েছে” বলা যাবে, কিন্তু কর্মচারীর পকেটে প্রকৃতপক্ষে তেমন কিছুই আসবে না।
উপসংহার: নামের বেতন বৃদ্ধি, বাস্তবে নয়
সব মিলিয়ে চিত্রটি পরিষ্কার — বেসিকের ৫০% মহার্ঘ ভাতা যদি ইনক্রিমেন্ট ও বিশেষ সুবিধা বাতিলের বিনিময়ে আসে, তাহলে সরকারি কর্মচারীরা প্রকৃত অর্থে লাভবান হবেন না। ৩০,০০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দের একটি বড় অংশ এমনিতেই প্রতি বছর লাগত, বাকিটুকু দিয়ে পুরনো সুবিধা বাতিল করে নতুন সুবিধার নাম দেওয়া হচ্ছে মাত্র।
এটি শুভংকরের ফাঁকি ছাড়া আর কিছু নয় — সংখ্যায় বড়, বাস্তবে ফাঁকা।
