সরকারি নিউজ আপডেট

১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের ইঙ্গিত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হয়নি, তবুও সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান ইতিবাচক এবং এ বিষয়ে আর কোনো অনিশ্চয়তা নেই। তবে বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ এখনো প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি খুব বেশি নেই এবং শিগগিরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

জুনেই গেজেট, জুলাই থেকে কার্যকর?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি জুন মাসের মধ্যেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, বাজেট বক্তব্যের চূড়ান্ত সংস্করণে নতুন পে-স্কেলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

বাজেট বক্তব্যে পরিবর্তনের আভাস

জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের প্রাথমিক খসড়ায় নতুন পে-স্কেলের বিষয়টি ছিল না। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি, প্রশাসনিক মহলের আলোচনা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ফলে বাজেট উপস্থাপনের আগে বক্তব্যে কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজেট ঘোষণার সময় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন বিষয়ে আরও পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যেতে পারে।

২০১৫ সালের পর প্রথম বড় বেতন সংস্কার

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নতুন পে-স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের লক্ষ্যে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সচিব কমিটির কাটছাঁট

তবে কমিশনের মূল সুপারিশের সবকিছু চূড়ান্তভাবে বহাল থাকছে না বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে গঠিত সচিব কমিটি কমিশনের বেশ কিছু প্রস্তাবে সংশোধন ও কাটছাঁটের সুপারিশ করেছে।

বিশেষ করে কুক, মালি, গাড়ি-সংক্রান্ত সুবিধা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কিছু অতিরিক্ত ভাতার বিষয়ে কমিশনের প্রস্তাব অপরিবর্তিত না রেখে পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে মূল বেতন কাঠামো ও গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বহাল রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আর্থিক চাপ সামাল দিতে নতুন পে-স্কেল একবারে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ বেসিক যুক্ত হবে।

তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা ও অতিরিক্ত সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর হঠাৎ করে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে না।

পেনশনভোগীদের জন্যও সুখবর

নতুন পে-স্কেলের আওতায় পেনশনভোগীরাও উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারেন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসিক ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তরা সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধি পেতে পারেন।

২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।

চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতায় বড় পরিবর্তন

পে-কমিশনের সুপারিশে বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।

এর আওতায় ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

চাকরিজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারণে বর্তমান বেতন কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হারিয়েছে।

তবে অনেক চাকরিজীবী ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো এক ধাপেই কার্যকর করা উচিত।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগব্যয় বাড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে সহায়ক হবে।

তবে একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ফলে রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সরকারকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।

এখনো অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার

যদিও বিভিন্ন সূত্র নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে আশাবাদী তথ্য দিচ্ছে, তবুও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো গেজেট, প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত ঘোষণা প্রকাশ করা হয়নি।

ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং সংশ্লিষ্ট মহল এখন আসন্ন বাজেট ঘোষণা ও সরকারি গেজেট প্রকাশের দিকেই তাকিয়ে আছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের বাস্তব রূপরেখা স্পষ্ট হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *