জমির খতিয়ানে একই দাগ নম্বরের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির নাম দেখা গেলে অনেকেই ধারণা করেন জমিটি হয়তো জটিলতা বা বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে বাস্তবে সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই দাগে একাধিক মালিকের নাম থাকা বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় একটি স্বাভাবিক ও প্রচলিত বিষয়, যার পেছনে বিভিন্ন আইনগত ও বাস্তব কারণ রয়েছে।
সম্প্রতি ভূমিসংক্রান্ত তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘ভূমি (Bhumi)’ এ বিষয়ে একটি সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, খতিয়ানে একাধিক নাম থাকলেই জমির মালিকানা নিয়ে সন্দেহ বা বিভ্রান্তিতে পড়ার কোনো কারণ নেই। বরং জমির প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য মালিকানা, অংশীদারিত্ব, রেকর্ড এবং বাস্তব দখলের বিষয়গুলো একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
কেন একই দাগে একাধিক মালিকের নাম থাকে?
ভূমি সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, একই দাগে একাধিক মালিকের নাম থাকার কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা
কোনো জমির মালিক মৃত্যুবরণ করলে তার উত্তরাধিকারীরা আইন অনুযায়ী জমির অংশীদার হন। এ ক্ষেত্রে জমির দাগ নম্বর অপরিবর্তিত থাকলেও খতিয়ানে একাধিক উত্তরাধিকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে একই জমিতে একাধিক মালিকের নাম দেখা স্বাভাবিক।
যৌথভাবে জমি ক্রয়
অনেক সময় একাধিক ব্যক্তি মিলে একটি জমি ক্রয় করেন। তখন দলিল ও খতিয়ানে সকল ক্রেতার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ধরনের জমিতে মালিকানা যৌথ হলেও দাগ নম্বর সাধারণত একটিই থাকে।
বণ্টন কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া
অনেক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী বা অংশীদারদের মধ্যে জমির আনুষ্ঠানিক বণ্টন সম্পন্ন হয়নি। ফলে জমির পৃথক অংশ বাস্তবে ব্যবহার করা হলেও সরকারি রেকর্ডে এখনও যৌথ মালিকানা বহাল থাকে। এ কারণেও একই দাগে একাধিক মালিকের নাম দেখা যায়।
বাস্তবে অংশ আলাদা থাকা
রেকর্ডে জমি একসঙ্গে থাকলেও বাস্তবে অংশীদারদের প্রত্যেকের দখলে পৃথক অংশ থাকতে পারে। অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে জমির ব্যবহার ভাগ হয়ে গেলেও খতিয়ান বা রেকর্ডে তা একক দাগ হিসেবে বহাল থাকতে পারে।
জমি কেনার আগে কী যাচাই করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র খতিয়ানে একাধিক নাম দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। জমি ক্রয়ের আগে অবশ্যই—
- সর্বশেষ খতিয়ান ও পর্চা যাচাই করতে হবে।
- নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন হয়েছে কি না দেখতে হবে।
- অংশীদারদের সম্মতি ও মালিকানার পরিমাণ নিশ্চিত করতে হবে।
- জমির বাস্তব দখল ও সীমানা পরিদর্শন করতে হবে।
- প্রয়োজন হলে ভূমি অফিস বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
সচেতনতার ওপর জোর
ভূমি বিষয়ক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি সংক্রান্ত অনেক ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে একই দাগে একাধিক মালিকের নাম দেখেই অনেক ক্রেতা জমি কেনা থেকে বিরত থাকেন। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি উত্তরাধিকার, যৌথ ক্রয় বা বণ্টন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফলাফল।
তাই জমি সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে খতিয়ানের তথ্য, মালিকানার অংশ, রেকর্ডের অবস্থা এবং বাস্তব দখল—সবকিছু সমন্বিতভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জমি কেনাবেচায় ঝুঁকি কমবে এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
