দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে নবম জাতীয় পে-স্কেল। জাতীয় বেতন কমিশনের প্রাথমিক সুপারিশে সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জন্যও উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব উঠে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পেনশন ও বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেলের আওতায় নিম্ন আয়ের পেনশনভোগীদের পেনশন দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশাখী ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং টিফিন ভাতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
পেনশন বৃদ্ধিতে তিন স্তরের প্রস্তাব
জাতীয় বেতন কমিশনের প্রাথমিক সুপারিশ অনুযায়ী, পেনশনভোগীদের বর্তমান আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে তিনটি স্তরে পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন কম পেনশনপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্তরা। যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার টাকার নিচে, তাদের পেনশন ১০০ শতাংশ বা দ্বিগুণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে ১৫ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া কোনো ব্যক্তি নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন।
এছাড়া যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের জন্য ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামোর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেনশনভোগীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন এবং তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা করা সহজ হবে।
বৈশাখী ভাতায় বড় পরিবর্তন
নবম পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো বৈশাখী ভাতা বৃদ্ধি। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন সুপারিশে এটি বাড়িয়ে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সরকারি কর্মচারীরা আগের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি বৈশাখী ভাতা পাবেন।
টিফিন ভাতা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের জন্য টিফিন ভাতায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে এই ভাতা মাসিক ২০০ টাকা হলেও নতুন সুপারিশে তা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
এতে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীরা দৈনন্দিন কর্মজীবনে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা ভাতাও বাড়ছে
সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য প্রদত্ত শিক্ষা ভাতা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি সন্তান বাবদ মাসিক শিক্ষা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ বিবেচনায় নিয়ে এই প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে কর্মচারীদের সন্তানদের শিক্ষাব্যয় আংশিকভাবে হলেও সহজ হবে।
মূল্যস্ফীতির চাপে স্বস্তির প্রত্যাশা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। বেতন কমিশনের সর্বশেষ সুপারিশে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।
তবে কমিশনের সুপারিশ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং গেজেট প্রকাশের পরই নতুন বেতন ও পেনশন কাঠামো কার্যকর হবে। ফলে পেনশন বৃদ্ধি ও ভাতা সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের আগে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
উপসংহার
নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রাথমিক সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের জন্য এটি হতে পারে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাগুলোর একটি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পেনশনভোগীদের পেনশন দ্বিগুণ করার প্রস্তাব তাদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বৈশাখী, শিক্ষা ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধি কর্মচারীদের আর্থিক স্বস্তি আরও বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
