আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারার সংশোধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ১ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স আরোপের বিধান নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যবসায়ী ও কর–সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, লাভের পরিবর্তে মোট বিক্রয়ের ওপর কর নির্ধারণ করলে কম মুনাফার ব্যবসাগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। তারা বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিধানটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্প্রতি আলোচনায় আসা একটি উদাহরণে দেখা যায়, কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বার্ষিক বিক্রয় (টার্নওভার) যদি ৪৫ লাখ টাকা হয় এবং সব ধরনের ব্যয় বাদ দিয়ে নীট লাভ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তাহলে প্রচলিত আয়ভিত্তিক কর হিসাব অনুযায়ী তাঁর করের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৫ হাজার টাকা। তবে ১ শতাংশ বাধ্যতামূলক টার্নওভার ট্যাক্স কার্যকর হলে একই ব্যবসায়ীকে কর দিতে হতে পারে ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত আয়ভিত্তিক করের তুলনায় অতিরিক্ত ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিক্রয় কি প্রকৃত আয়?
কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসার মোট বিক্রয় (Turnover) এবং প্রকৃত লাভ (Profit) এক বিষয় নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় থেকে পণ্য ক্রয়মূল্য, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দোকান বা কারখানার ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক চার্জ, ঋণের সুদ, বিপণন ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, সেটিই প্রকৃত মুনাফা।
এ কারণে লাভ কম হলেও বিক্রয় বেশি এমন ব্যবসাগুলো টার্নওভারভিত্তিক কর ব্যবস্থায় তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, বাধ্যতামূলক টার্নওভার ট্যাক্সের ফলে—
- কম মুনাফার ব্যবসার করের বোঝা বেড়ে যেতে পারে।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
- নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
- বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
- দীর্ঘমেয়াদে কিছু ব্যবসা অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা রাজস্ব আহরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের উদ্দেশ্য ও বাস্তবতার ভারসাম্য
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও করনীতি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে ব্যবসা পরিচালনা টেকসই থাকে এবং করদাতার সংখ্যা বাড়ে। ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্বও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, যেসব খাতে লাভের হার তুলনামূলক কম, সেসব ক্ষেত্রে একই হারে টার্নওভার ট্যাক্স আরোপ ন্যায়সঙ্গত কি না—সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
পুনর্বিবেচনার দাবি
কর–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল মনে করছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারার আওতায় ১ শতাংশ বাধ্যতামূলক টার্নওভার ট্যাক্স বাস্তবায়নের আগে বা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ব্যবসার ধরন, লাভের হার এবং প্রতিষ্ঠানের আকার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা যেতে পারে।
তাদের প্রস্তাব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রয়োজন হলে এসআরও (SRO) জারি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য পৃথক সুবিধা, ন্যূনতম করের সীমা বা খাতভিত্তিক ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
উপসংহার
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারার ১ শতাংশ বাধ্যতামূলক টার্নওভার ট্যাক্স নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো—মোট বিক্রয়ের ওপর কর আরোপ কি সব ধরনের ব্যবসার জন্য সমানভাবে ন্যায়সংগত? বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের লাভের মার্জিন কম, তাদের ক্ষেত্রে এই বিধান করের ভার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
তবে এ বিষয়টি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত। তাই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
