বাংলাদেশে প্রচলিত চেক ডিজঅনার বা ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট’ (NI Act) সংক্রান্ত মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের চেক ডিজঅনার মামলার বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট অথবা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
পূর্বে যে কোনো অংকের চেক ডিজঅনার মামলার বিচারের প্রাথমিক ক্ষমতা কেবল দায়রা আদালতগুলোর হাতে ন্যস্ত ছিল। সরকারের এই নতুন উদ্যোগের ফলে বিচার ব্যবস্থার জট নিরসনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইনি পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চেক ডিজঅনার মামলার সংখ্যা অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উচ্চ আদালত ও জেলা দায়রা আদালতগুলোতে মামলার পাহাড় জমে গিয়েছিল। বিশেষ করে ছোট অংকের চেক সংক্রান্ত মামলার জন্য বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এই সমস্যা সমাধানে The Negotiable Instruments (Amendment) Ordinance, 2026 এর মাধ্যমে বিচারিক ক্ষমতায় এই পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী বিচারিক এখতিয়ার
গেজেট ও আইনি সূত্র অনুযায়ী বিচারিক ক্ষমতার বিভাজন নিম্নরূপ:
৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত: এই অংকের চেকের মামলার বিচার করবেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (মেট্রোপলিটন এলাকায়) অথবা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা পর্যায়ে)।
৫ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে: চেক বা চেকের অংক যদি ৫ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তবে আগের নিয়মেই মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ অথবা যুগ্ম জেলা দায়রা জজ আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলবে।
সাধারণ মানুষের জন্য সুবিধা
১. দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি: ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচার প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত হওয়ায় ছোট অংকের পাওনা আদায়ের মামলাগুলো এখন থেকে অনেক কম সময়ে নিষ্পত্তি হবে। ২. হয়রানি হ্রাস: ছোট অংকের মামলার জন্য বারবার জেলা দায়রা আদালতে যাওয়ার ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি পাবে। ৩. মামলা জট নিরসন: উচ্চতর আদালতগুলো বড় বড় জালিয়াতি বা বড় অংকের মামলার দিকে বেশি মনোনিবেশ করার সুযোগ পাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য
মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে নোটিশ প্রদানের নিয়ম বা অন্যান্য আইনি বাধ্যবাধকতা আগের মতোই বহাল থাকছে। অর্থাৎ, চেক ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা দায়েরের নিয়ম অপরিবর্তিত রয়েছে। শুধুমাত্র বিচারের জন্য নির্ধারিত আদালতের স্তরে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন এবং দেশের আদালতগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান মামলার চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।

১ লক্ষ টাকার চেক ডিজঅনার হলে কোথায় মামলা করতে হবে?
১ লক্ষ টাকার চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রেও আপনাকে আগের মতোই প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে আদালতে মামলা করতে হবে। আপনার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যেহেতু ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মামলার বিচারের দায়িত্ব এখন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে দেওয়া হয়েছে, তাই ১ লক্ষ টাকার মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখন এই স্তরের আদালতেই সম্পন্ন হবে।
মামলা করার স্থান এবং প্রক্রিয়াটি নিচে সহজভাবে দেওয়া হলো:
১. মামলা কোথায় করবেন?
চেক ডিজঅনার মামলার ক্ষেত্রে আপনি নিচের যে কোনো একটি এলাকার আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন:
যেখানে চেকটি দেওয়া হয়েছে।
যে ব্যাংকে আপনি চেকটি জমা দিয়েছেন (যেখানে চেক ডিজঅনার হয়েছে)।
যেখান থেকে আপনি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন।
বিবাদী (যে চেক দিয়েছে) যেখানে বসবাস করেন বা ব্যবসা করেন।
আদালতের ধরণ: * মেট্রোপলিটন এলাকায়: মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
জেলা পর্যায়ে: সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
২. মামলা করার আগে যা অবশ্যই করতে হবে:
সরাসরি আদালতে যাওয়ার আগে আপনাকে ৩টি ধাপ পার করতে হবে (NI Act এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী):
চেক ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ: ব্যাংক থেকে চেকটি ফেরত নেওয়ার সময় কেন টাকা দেওয়া হয়নি তার কারণসহ একটি ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ করতে হবে।
লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো: চেক ডিজঅনার হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চেকদাতাকে আইনজীবীর মাধ্যমে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশে টাকা পরিশোধের জন্য চেকদাতাকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে।
মামলা দায়ের: নোটিশ পাওয়ার পরও যদি চেকদাতা ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করেন, তবে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপনাকে আদালতে মামলা করতে হবে।
৩. প্রয়োজনীয় নথিপত্র:
মামলা করার সময় আপনার সাথে নিচের কাগজগুলো থাকতে হবে: ১. মূল চেক। ২. ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত ডিজঅনার স্লিপ। ৩. লিগ্যাল নোটিশের কপি। ৪. নোটিশ পাঠানোর পোস্টাল রসিদ (Registered Post with AD হলে ভালো)।
টিপস: মনে রাখবেন, চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সেটি ব্যাংকে জমা দিতে হবে, অন্যথায় চেকের কার্যকারিতা থাকে না।
