ফৌজদারি মামলায় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরি থেকে বরখাস্ত হলে এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পেলে তিনি কি পুনরায় চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন—এমন প্রশ্ন সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। বিশেষ করে খালাসের রায়ের পর পুনর্বহালের আবেদন, সরকারের পক্ষ থেকে আপিল করা হলে করণীয় এবং চাকরিচ্যুত সময়ের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে চাকরি থেকে অপসারিত, বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত কোনো কর্মচারী পরবর্তী সময়ে আপিল বা উচ্চতর আদালতের রায়ে খালাস পেলে তার চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু খালাসের রায়ের কপি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মস্থলে যোগদান কার্যকর হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, রায়ের চূড়ান্ততা এবং নিয়োগকারী বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক আদেশ গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টে খালাস পেলেই কি চাকরিতে পুনর্বহাল হওয়া যাবে?
কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে চাকরি হারানোর পর হাইকোর্ট বিভাগ থেকে খালাস পেলে প্রথমে দেখতে হবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ আপিল করেছে কি না।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সেই সময়সীমা শেষ হওয়া এবং আপিল করা হয়েছে কি না—এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে সাধারণত আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নির্ভর করতে পারে। বিশেষ করে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হলে বা আপিল বিভাগ কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেই আদেশ অনুসরণ করতে হবে।
অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করা না হলে এবং খালাসের রায় কার্যকর থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারেন।
পুনর্বহালের আবেদনের সঙ্গে যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে
চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে সাধারণত হাইকোর্ট বিভাগের খালাসের রায়ের সার্টিফায়েড বা জাবেদা কপি, মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কিত তথ্য, আপিল দায়ের হয়েছে কি না তার প্রমাণ এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের আদেশের কপি সংযুক্ত করা প্রয়োজন হতে পারে।
আপিল দায়ের হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আদালতের তথ্য শাখা থেকে Information Slip, মামলার Case Status বা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি আইন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে প্রত্যয়ন সংগ্রহ করা যেতে পারে।
এরপর এসব কাগজপত্রসহ সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর প্রযোজ্য বিধানের আলোকে চাকরিতে পুনর্বহাল এবং প্রাপ্য চাকরিগত সুবিধা দেওয়ার আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা যেতে পারে।
শুধু যোগদানপত্র দিলেই কি চাকরিতে যোগদান কার্যকর হবে?
আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালত থেকে খালাস পাওয়ার পর সরাসরি কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে যোগদানপত্র জমা দিলেই সব ক্ষেত্রে চাকরিতে পুনর্বহাল কার্যকর হয় না।
কারণ চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ বা চাকরিচ্যুত করার জন্য আগে একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছিল। ফলে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সেই আদেশ প্রত্যাহার, বাতিল বা সংশোধন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পুনর্বহালের প্রশাসনিক আদেশ জারি করতে হতে পারে।
এ কারণে খালাসের রায়ের জাবেদা কপি, আপিল সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহালের আবেদন করাই নিরাপদ প্রশাসনিক পদ্ধতি।
রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে কী হবে
হাইকোর্ট বিভাগের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে আপিল দায়ের হলেই হাইকোর্ট বিভাগের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায়—এমন ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেছে কি না, কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ রয়েছে কি না এবং মামলার বর্তমান অবস্থা কী—এসব বিষয় যাচাই করতে হবে।
ফলে আপিল বিচারাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পুনর্বহালের আবেদন কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা আদালতের আদেশ, সরকারি চাকরি আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
চাকরিচ্যুত সময়ের বেতন-ভাতা কি পাওয়া যাবে?
খালাস পাওয়ার পর চাকরিতে পুনর্বহাল হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত থাকা সময়ের বেতন-ভাতা, জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে কি না—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এ ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের ভাষা, বরখাস্তের আদেশের কারণ, পুনর্বহালের প্রশাসনিক আদেশ এবং সরকারি চাকরি আইন ও প্রযোজ্য বিধিমালা বিবেচনা করতে হবে।
ফলে পুনর্বহাল হলেই মামলা চলাকালীন বা চাকরিচ্যুত পুরো সময়ের বেতন-ভাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী ওই সময়কালকে কর্তব্যকাল, ছুটি বা অন্য কোনোভাবে গণ্য করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পুনর্বহালের আবেদনের সঙ্গে বকেয়া বেতন-ভাতা, জ্যেষ্ঠতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং অন্যান্য প্রাপ্য চাকরিগত সুবিধা দেওয়ার আবেদন করতে পারেন।
পুনর্বহালের নজির কেন গুরুত্বপূর্ণ
ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হয়ে চাকরি হারানোর পর উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাওয়া সরকারি কর্মচারীদের পুনর্বহালের একাধিক ঘটনা বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন ও আদালতের সামনে এসেছে। তবে প্রতিটি মামলার ঘটনা, অভিযোগের প্রকৃতি, খালাসের কারণ, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সার্ভিস রুলস ভিন্ন হতে পারে।
এ কারণে একই ধরনের কোনো মামলায় হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগের রায়, সরকারি কর্মচারীকে পুনর্বহালের প্রশাসনিক আদেশ অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সিদ্ধান্তের কপি পাওয়া গেলে তা আবেদন নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক নজির হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
যেভাবে এগোতে পারেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারী
প্রথমে হাইকোর্ট বিভাগের খালাসের রায়ের সার্টিফায়েড বা জাবেদা কপি সংগ্রহ করতে হবে। এরপর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে কি না এবং কোনো স্থগিতাদেশ রয়েছে কি না তা আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা বা সরকারি আইন কর্মকর্তার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আপিল না হয়ে থাকলে Information Slip, Case Status বা প্রয়োজন অনুযায়ী আপিল না হওয়ার সমর্থনে প্রাপ্ত নথি সংগ্রহ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পুনর্বহালের আবেদন দাখিল করা যেতে পারে।
আবেদনে চাকরিতে পুনর্বহাল, চাকরির ধারাবাহিকতা, জ্যেষ্ঠতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং আইন অনুযায়ী প্রাপ্য বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিষয়ে স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত চাওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা
ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাওয়া সরকারি কর্মচারীর চাকরিতে ফিরে আসার আইনি সুযোগ থাকতে পারে। তবে খালাসের রায় পাওয়ার পর পুনর্বহাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে কি না, কোনো স্থগিতাদেশ রয়েছে কি না, খালাসের রায় চূড়ান্ত হয়েছে কি না এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ পুনর্বহালের প্রশাসনিক আদেশ জারি করেছে কি না—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর উচিত খালাসের রায়ের জাবেদা কপি ও মামলার সর্বশেষ অবস্থা সংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পুনর্বহাল ও চাকরিগত সুবিধা চেয়ে আবেদন করা। একই ধরনের মামলায় উচ্চ আদালতের রায় বা সরকারি পুনর্বহাল আদেশের নজির পাওয়া গেলে তা আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করলে সংশ্লিষ্ট দাবি আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
