বিবাহ ও তালাক তথ্য

স্বামী মাদকাসক্ত হলে কীভাবে তালাক নেবেন? জানুন নারীদের আইনি অধিকার ও উপায়

মাদক কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি বা স্বাস্থ্যগত সমস্যাই নয়, দাম্পত্য জীবনের আঙিনায় এটি একটি চরম অভিশাপ। প্রতিনিয়ত বহু পরিবার মাদকের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কোনো স্ত্রী যদি মাদকাসক্ত বা নেশাগ্রস্ত স্বামীর সাথে আর সংসার করতে না চান, তবে মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারীদের আত্মরক্ষা ও সম্মানজনকভাবে বিচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট অধিকার দেওয়া হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্ত স্বামীর হাত থেকে মুক্তি পেতে একজন স্ত্রীর সামনে মূলত দুটি আইনি পথ খোলা রয়েছে।

১. কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে (তাৎক্ষণিক সমাধান)

মুসলিম বিয়েতে কনে বা স্ত্রীকে সুরক্ষার জন্য কাবিননামা বা নিকাহনামায় একটি বিশেষ অধিকার দেওয়া থাকে। যদি বিয়ের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন (যাকে আইনি ভাষায় ‘তালাক-ই-তৌফিজ’ বলা হয়), তবে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।

  • আদালত ছাড়াই মুক্তি: এক্ষেত্রে স্ত্রীকে আদালতের বারান্দায় গিয়ে স্বামীর নেশাগ্রস্ততার কথা প্রমাণ করার জন্য বছরের পর বছর ঘুরতে হয় না।

  • আইনি প্রক্রিয়া: ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী, স্ত্রী স্রেফ স্বামীকে একটি লিখিত নোটিশ পাঠিয়ে এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়র কার্যালয়ে তার কপি জমা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পারেন। নোটিশে কারণ হিসেবে “স্বামীর মাদকাসক্তি ও বনিবনা না হওয়া” উল্লেখ করাই যথেষ্ট।

  • দেনমোহরের অধিকার: এই পদ্ধতিতে তালাক দিলেও স্ত্রী হিসেবে সম্পূর্ণ দেনমোহর পাওয়ার অধিকার শতভাগ বহাল থাকে।

২. আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ (১৮ নম্বর কলামে ‘না’ থাকলে)

যদি কোনো কারণে কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামটি কেটে দেওয়া থাকে বা সেখানে ‘না’ লেখা থাকে, তবে স্ত্রী চাইলেই সরাসরি নোটিশ দিয়ে তালাক দিতে পারেন না। তখন তাকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।

এক্ষেত্রে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন (The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939)-এর ২ ধারা অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে (Family Court) মামলা করতে হবে। এই আইন অনুযায়ী, স্বামী যদি নেশাগ্রস্ত হন এবং তার ফলে পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত হয়, তবে তা ‘নিষ্ঠুরতা’ বা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের (Cruelty) শামিল। এই ধারার অধীনে মামলা করে স্ত্রী আদালতের রায়ের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ লাভ করতে পারেন।

আদালতে মামলা জেতার জন্য কী কী প্রমাণ লাগবে?

আদালতের মাধ্যমে একতরফা বিচ্ছেদ ও রায় পেতে হলে স্বামীর নেশাগ্রস্ততার বিষয়টি বিজ্ঞ বিচারকের সামনে প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। সেজন্য ভুক্তভোগী স্ত্রীকে তার আইনজীবীর মাধ্যমে নিচের প্রমাণগুলো আদালতে উপস্থাপন করতে হবে:

  • রিহ্যাব বা হাসপাতালের নথিপত্র: স্বামীকে যদি আগে কখনো মাদক নিরাময় কেন্দ্র (Rehab) বা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই ভর্তির রসিদ, প্রেসক্রিপশন বা ডিসচার্জ সার্টিফিকেট।

  • থানার জিডি বা মামলা: স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে মারধর বা অত্যাচার করলে যদি থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (GD) বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়ে থাকে, তবে তার সার্টিফাইড কপি।

  • সাক্ষীদের জবানবন্দি: শ্বশুরবাড়ির লোকজন, প্রতিবেশী বা বাড়ির দারোয়ান—যারা স্বামীকে নিয়মিত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখেছেন বা স্ত্রীর ওপর নির্যাতন হতে দেখেছেন, আদালতে তাদের মৌখিক সাক্ষ্য।

  • ডোপ টেস্ট বা মেডিকেল রিপোর্ট: আদালতের নির্দেশে যদি স্বামীর কোনো ডোপ টেস্ট (Drug Test) করানো সম্ভব হয় এবং সেই রিপোর্ট পজিটিভ আসে, তবে তা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়।

সন্তান ও ভরণপোষণের অধিকার: আইন কী বলে?

স্বামী নেশাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিচ্ছেদ হলেও দুটি বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইন স্ত্রীকে পূর্ণ সুরক্ষা দেয়:

সন্তানের হেফাজত (Custody): যেহেতু বাবা একজন মাদকাসক্ত এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ, তাই বিজ্ঞ আদালত সন্তানের জিম্মাদারি বা হেফাজত মায়ের কাছেই রাখেন। নেশাগ্রস্ত বাবাকে সাধারণত কোনো অবস্থাতেই সন্তান দেওয়া হয় না।

খোরপোশ ও ভরণপোষণ: ডিভোর্স হয়ে গেলেও সন্তানের বাবা হিসেবে সন্তানদের ভরণপোষণ, পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ দিতে ওই স্বামী আইনত বাধ্য থাকবেন।

শেষ কথা

আইনজীবীদের মতে, মাদকাসক্ত স্বামীর অত্যাচার সহ্য করা কোনো পুণ্য বা ধৈর্যের পরিচয় নয়। বরং নিজের জীবন রক্ষা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সঠিক সময়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। কাবিনে ক্ষমতা থাকলে নোটিশের মাধ্যমে, আর ক্ষমতা না থাকলে ১৯৩৯ সালের আইনের আশ্রয় নিয়ে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে এই বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে সম্মানজনকভাবে বের হয়ে আসা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *