ফৌজদারি মামলায় কোনো ঘটনার বিষয়ে থানায় প্রথম এফআইআর দায়ের হয়ে যাওয়ার পর একই ঘটনা নিয়ে আবার দ্বিতীয় এফআইআর করা যাবে কি না—আইন ও বিচার অঙ্গনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। সাধারণ নিয়ম হলো, একই ঘটনা ও একই অপরাধকে কেন্দ্র করে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুন করে আরেকটি এফআইআর করার সুযোগ সীমিত। তবে প্রথম তথ্যটি যদি এতটাই অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ হয় যে প্রকৃত অপরাধই প্রকাশ পায় না, পরবর্তী তথ্যের মাধ্যমে যদি ভিন্ন বা প্রকৃত কোনো আমলযোগ্য অপরাধ প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
সম্প্রতি আলোচিত একটি আইনি ব্যাখ্যায় এই ব্যতিক্রমী দিকটিই সামনে এসেছে। ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে—কোনো ঘটনার বিষয়ে থানায় দেওয়া প্রথম তথ্য অস্পষ্ট হলে এবং ওই ঘটনায় সংঘটিত প্রকৃত অপরাধ প্রথম তথ্যে প্রকাশ না পেলে, পরবর্তী সময়ে প্রকৃত অপরাধের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর দ্বিতীয় এফআইআর করার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগত বাধা সৃষ্টি হয় না। সেখানে ‘শফিকুল আজম দফাদার বনাম রাষ্ট্র, (২০১৯) (২৭) বিএলটি (এডি) ১৯’ মামলার নজির উল্লেখ করা হয়েছে।
এফআইআর আসলে কী?
এফআইআর বা First Information Report হলো কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে পুলিশের কাছে পাওয়া প্রথম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যার ভিত্তিতে ফৌজদারি আইনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য মূলত আদালতে অপরাধ প্রমাণ করে দেওয়া নয়; বরং পুলিশকে অপরাধের তদন্তে আইনগতভাবে সক্রিয় করার ভিত্তি তৈরি করা।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য থানায় লিপিবদ্ধ করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশি আইনবিষয়ক রেফারেন্সগুলোতেও বলা হয়েছে, এফআইআর করার জন্য তথ্যদাতা নিজে ভুক্তভোগী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; মূল বিষয় হলো আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছানো।
তাই প্রথম এফআইআরে কোনো তথ্য বাদ পড়েছে বলেই সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল বা অকার্যকর ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত চলাকালে নতুন তথ্য, সাক্ষ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সেগুলো তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
তাহলে দ্বিতীয় এফআইআর নিয়ে সমস্যা কোথায়?
একই ঘটনা নিয়ে একের পর এক এফআইআর দায়েরের সুযোগ অবাধ করে দিলে একটি ঘটনার জন্য একাধিক তদন্ত, একাধিক মামলা এবং পরস্পরবিরোধী বিচারিক প্রক্রিয়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় হয়রানি, প্রতিহিংসামূলক মামলা কিংবা একই ঘটনার ওপর একাধিকবার তদন্তের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাধারণ নীতিটি হলো—প্রথম এফআইআর দায়ের হওয়ার পর তদন্ত চলাকালে একই ঘটনার বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সেটি সাধারণত প্রথম মামলার তদন্তেই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। অন্য একটি বিচারিক ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, একই ঘটনা বা একই লেনদেনের অংশ হলে পরবর্তী এফআইআর সাধারণত টেকসই হয় না; তবে দ্বিতীয় তথ্য যদি প্রকৃত অর্থে ভিন্ন ঘটনা বা পৃথক অপরাধ প্রকাশ করে, তখন পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।
অর্থাৎ, ‘দ্বিতীয় এফআইআর করা যায়’—এমন কোনো সাধারণ ও অবাধ নিয়ম নেই। আবার ‘কখনোই দ্বিতীয় এফআইআর করা যায় না’—এমন সরলীকরণও সঠিক নয়।
প্রথম তথ্য অস্পষ্ট হলে ব্যতিক্রম কেন?
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে থানায় এমন তথ্য দেওয়া হলো যে তিনি বিষপান করে মারা গেছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করল। পরে ময়নাতদন্ত, সাক্ষ্য বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণে যদি দেখা যায় যে ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়, বরং হত্যাকাণ্ড, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—প্রথম এফআইআরেই যেহেতু মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ ছিল, নতুন করে হত্যা মামলা করা যাবে কি না?
বাংলাদেশি বিচারিক নজিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ Abdul Khaleque বনাম State, 53 DLR (AD) 102। আইনবিষয়ক সংকলনে এই মামলার সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীর বাবা প্রথমে বিষপানের কারণে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে এফআইআর করলেও পরবর্তী সময়ে যদি প্রকাশ পায় যে মৃত্যু আসলে হত্যাজনিত, তাহলে দ্বিতীয় এফআইআর করার ক্ষেত্রে সেই প্রথম এফআইআর নিজেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
এখানেই মূল পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ—দ্বিতীয় এফআইআরটি যদি প্রথম এফআইআরের বক্তব্যকে শুধু বড় করে বা নতুন কিছু তথ্য যোগ করে, তাহলে সেটি সাধারণত গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রথম তথ্যের মধ্যে প্রকৃত অপরাধের চরিত্রই যদি প্রকাশ না পায় এবং পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটিত হয়, তাহলে আদালত বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে পারেন।
‘অস্পষ্ট তথ্য’ আর ‘নতুন তথ্য’ এক বিষয় নয়
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম এফআইআরে যদি লেখা থাকে—‘কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করেছে’, পরে তদন্তের সময় আরও জানা গেল কে কীভাবে আঘাত করেছে, কে অস্ত্র ব্যবহার করেছে কিংবা কে ঘটনাস্থলে ছিল—এসব তথ্য সাধারণত প্রথম মামলার তদন্তের অংশ হতে পারে। শুধু এসব অতিরিক্ত তথ্যের কারণে দ্বিতীয় এফআইআর করার প্রয়োজন হয় না।
কিন্তু প্রথম এফআইআরে যদি এমনভাবে ঘটনা বর্ণিত হয় যে অপরাধের প্রকৃত চরিত্রই বোঝা যায় না এবং পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয় যে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তখন আদালতকে দেখতে হবে দ্বিতীয় তথ্যটি নিছক ‘অতিরিক্ত বর্ণনা’ নাকি প্রকৃতপক্ষে নতুন ও স্বতন্ত্র অপরাধের প্রকাশ।
এই পার্থক্য নির্ধারণে শুধু এফআইআরের শিরোনাম নয়, বরং ঘটনার প্রকৃতি, সময়, স্থান, ভুক্তভোগী, অভিযুক্ত, অপরাধের ধরন এবং দুই তথ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। একই ঘটনার ক্ষেত্রে ‘সামেনেস টেস্ট’ বা ঘটনার অভিন্নতা যাচাইয়ের নীতিও বিচারিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় এফআইআর করার আগে কী দেখতে হবে?
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি—
প্রথমত, প্রথম এফআইআরে প্রকৃত অপরাধের তথ্য ছিল কি না।
দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় এফআইআরে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা কি প্রথম এফআইআরেরই বিস্তারিত সংস্করণ, নাকি সম্পূর্ণ নতুন অপরাধের প্রকাশ।
তৃতীয়ত, দ্বিতীয় তথ্যটি কি তদন্ত শুরু হওয়ার পর নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে এসেছে, নাকি প্রথম থেকেই তা জানার সুযোগ ছিল।
চতুর্থত, দ্বিতীয় এফআইআরটি কি একই ঘটনার ওপর নতুন করে মামলা তৈরির চেষ্টা, নাকি প্রকৃতপক্ষে পৃথক অপরাধের তথ্য প্রকাশ করছে।
পঞ্চমত, দ্বিতীয় এফআইআর করার পেছনে কোনো হয়রানি, প্রতিশোধ, চাপ সৃষ্টি বা মামলাকে জটিল করার উদ্দেশ্য রয়েছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে নির্দিষ্ট মামলার তথ্য-প্রমাণ ও পরিস্থিতির ওপর।
এফআইআরে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলেই কি মামলা শেষ?
না। এফআইআর কোনো মামলার চূড়ান্ত প্রমাণপত্র নয়। এতে কোনো তথ্যের ঘাটতি থাকলেই পুরো মামলার ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়—এমন নয়।
তদন্তের সময় সাক্ষীর বক্তব্য, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, আলামত, জব্দকৃত বস্তু, ফরেনসিক তথ্য, ডিজিটাল প্রমাণসহ বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করা যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেন।
এ কারণে একই ঘটনার পরবর্তী তথ্য সাধারণত প্রথম মামলার তদন্তে যুক্ত করার ব্যবস্থাই প্রচলিত। তবে প্রথম তথ্যের প্রকৃতি এমন হলে যে প্রকৃত অপরাধটি সেখানে আদৌ প্রকাশ পায়নি, তখন ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে নতুন এফআইআরের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। বাংলাদেশের একটি বিচারিক সংকলনেও একই ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তথ্যের ধরন ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী দ্বিতীয় এফআইআরের বৈধতার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
আদালত কেন বিষয়টি কঠোরভাবে দেখেন?
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক লক্ষ্য হলো প্রকৃত অপরাধের সঠিক তদন্ত এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তিকে একই ঘটনার ভিত্তিতে বারবার মামলা ও তদন্তের মাধ্যমে হয়রানি থেকেও সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
যদি একই ঘটনার জন্য ইচ্ছামতো একাধিক এফআইআর করার সুযোগ থাকে, তাহলে কোনো ব্যক্তি প্রথম মামলার পর আরও গুরুতর অভিযোগ যোগ করে নতুন মামলা করতে পারেন। আবার উল্টোভাবে, প্রথম এফআইআরে প্রকৃত অপরাধ গোপন থাকলে কেবল ‘আগে একটি এফআইআর হয়েছে’—এই যুক্তিতে প্রকৃত অপরাধের তদন্ত বন্ধ করে দেওয়াও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে।
এই দুই বিপরীত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই আদালতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ।
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
সুতরাং, কোনো ঘটনায় প্রথম এফআইআর হওয়ার পর দ্বিতীয় এফআইআর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধও নয়, আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধও নয়। মূল প্রশ্ন হলো—দ্বিতীয় এফআইআরে কি একই অপরাধ ও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, নাকি প্রথম তথ্যের অস্পষ্টতার কারণে আড়ালে থাকা প্রকৃত ও পৃথক আমলযোগ্য অপরাধ পরবর্তী সময়ে প্রকাশ পেয়েছে।
সরবরাহ করা নথিতে উদ্ধৃত শফিকুল আজম দফাদার বনাম রাষ্ট্র, (২০১৯) ২৭ BLT (AD) 19 মামলার মূল বার্তাও এই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে—প্রথম তথ্য যদি প্রকৃত অপরাধ প্রকাশে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে প্রকৃত অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।
একই সঙ্গে Abdul Khaleque বনাম State, 53 DLR (AD) 102-এর নীতিও দেখায়, প্রথম এফআইআরে মৃত্যুর কারণ ভুল বা অসম্পূর্ণভাবে উঠে এলেও পরবর্তী সময়ে হত্যার মতো প্রকৃত অপরাধ প্রকাশ পেলে আইনি প্রতিকারের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
শেষ কথা
আইনের চোখে এফআইআর কোনো ‘চূড়ান্ত গল্প’ নয়; এটি অপরাধের তদন্ত শুরুর দরজা। কিন্তু সেই দরজা একবার খোলার পর একই ঘটনার নামে বারবার নতুন মামলা করার সুযোগও সীমাহীন নয়। তাই দ্বিতীয় এফআইআরের বৈধতা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রথম তথ্যের প্রকৃতি এবং পরবর্তী তথ্যে প্রকাশ পাওয়া অপরাধের স্বতন্ত্রতা।
ফলে কারও বিরুদ্ধে একই ঘটনার দ্বিতীয় এফআইআর হয়েছে—শুধু এই কারণেই সেটি বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা যায় না। মামলার প্রকৃত ঘটনা, প্রথম এফআইআরের বক্তব্য, দ্বিতীয় অভিযোগের ধরন, তদন্তের পর্যায় এবং প্রাসঙ্গিক বিচারিক নজির মিলিয়ে আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাস্তব কোনো মামলায় এ ধরনের প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট এফআইআর, মামলার নথি ও আদালতের আদেশ দেখে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

