জমি, স্বর্ণ ও টাকার হিসাব এক জায়গায় এনে ওয়ারিশদের সম্ভাব্য অংশ দেখায় বাংলা ভাষার একটি ক্যালকুলেটর। তবে পূর্ণ তথ্য ছাড়া তৈরি প্রতিবেদন, অপরিশোধিত দায় এবং জমির বাস্তব ভাগবাঁটোয়ারা—এই তিন জায়গায় ব্যবহারকারীর সতর্ক থাকা জরুরি।
মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া দুই বিঘা জমি, কিছু স্বর্ণ আর ব্যাংকের টাকা কীভাবে ভাগ হবে—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পরিবারের সদস্যদের সাধারণত সম্পদের পরিমাণ ও সব ওয়ারিশের পরিচয় একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। ‘জমি বন্টন ক্যালকুলেটর’ নামের একটি ওয়েব অ্যাপ সেই প্রাথমিক কাজটি সহজ করার চেষ্টা করেছে। ওয়ারিশ ও সম্পদের তথ্য লিখলেই স্ক্রিনে প্রত্যেকের সম্ভাব্য অংশ ভগ্নাংশ, শতাংশ এবং সম্পদের পরিমাণে দেখায়।
তবে সরবরাহ করা অ্যাপটির সোর্স কোড বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি হিসাবের খসড়া তৈরির ব্যবস্থা, সম্পত্তি বণ্টন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নয়। বিশেষ করে কে প্রকৃত ওয়ারিশ, মৃত ব্যক্তির নামে কোন সম্পদ ছিল এবং কোনো দায় এখনও পরিশোধের বাকি আছে কি না—এসবের সত্যতা সফটওয়্যার নিজে যাচাই করতে পারে না।
কীভাবে কাজ করে ক্যালকুলেটর
অ্যাপটিতে প্রথমে আবেদনকারী ও মৃত ব্যক্তির নাম, পিতার নাম, মৃত্যুর তারিখ এবং ঠিকানা দেওয়ার ঘর রয়েছে। এরপর সম্পর্ক বেছে ওয়ারিশদের যুক্ত করতে হয়। স্বামী বা স্ত্রী, পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যার পাশাপাশি দাদা-দাদি, নাতি-নাতনি, বিভিন্ন শ্রেণির ভাই-বোন এবং পিতৃকুলের আরও কিছু আত্মীয়ের বিকল্প রাখা হয়েছে।
সম্পদের অংশে জমির একাধিক সারি যোগ করা যায়। প্রতিটি সারিতে দাগ নম্বর বা বিবরণ লিখে একর, বিঘা, কাঠা, শতাংশ কিংবা বর্গফুটে পরিমাণ দেওয়া সম্ভব। স্বর্ণের হিসাব নেওয়া হয় ভরি, আনা ও রতিতে। নগদ অর্থ এবং ব্যাংক বা অন্যান্য হিসাবের জন্য রয়েছে আলাদা ঘর। প্রতি শতাংশ জমি ও প্রতি ভরি স্বর্ণের আনুমানিক দর দিলে টাকার মূল্যে অংশও দেখায় প্রতিবেদন।
শেষ ধাপে কাফন-দাফনের খরচ, ঋণ, অনাদায়ী দেনমোহর ও ওসিয়তের শতকরা হার দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তথ্য পাল্টালে প্রতিবেদনও হালনাগাদ হয়। প্রতিবেদনে ওয়ারিশের অংশের পাশাপাশি সেই অংশ দেওয়ার বা না দেওয়ার একটি কারণ দেখানোর চেষ্টা করে অ্যাপটি।
‘৭৬ শতাংশ জমি’ দেখালেই নির্দিষ্ট দাগ ভাগ হয়ে যায় না
ক্যালকুলেটরের নমুনা তথ্যে দুই বিঘা আবাদি জমি এবং ১০ শতাংশ বসতভিটা রয়েছে। সফটওয়্যার এক বিঘাকে ৩৩ শতাংশ ধরে; সে হিসাবে নমুনার মোট জমি দাঁড়ায় ৭৬ শতাংশ। এরপর প্রত্যেকের উত্তরাধিকারী অংশ অনুযায়ী মোট জমি থেকে প্রাপ্য পরিমাণ বের করে।
এখানেই হিসাব ও বাস্তব বণ্টনের পার্থক্য। প্রতিবেদনে কেউ মোট জমির নির্দিষ্ট সংখ্যক শতাংশের অধিকারী হিসেবে দেখা গেলেও কোন দাগের কোন পাশের জমি তিনি পাবেন, তা ক্যালকুলেটর ঠিক করে না। বসতভিটা ও আবাদি জমির মূল্যও এক নাও হতে পারে। অথচ আনুমানিক মূল্য হিসাবের জন্য অ্যাপটি সব জমিতে একটি অভিন্ন ‘প্রতি শতাংশ দর’ ব্যবহার করে। তাই প্রতিবেদনের জমির পরিমাণ বা মূল্য দেখে সরাসরি সীমানা নির্ধারণ কিংবা বণ্টননামা তৈরি করা ঠিক হবে না।
ভূমির এককেও সতর্কতা প্রয়োজন। সফটওয়্যারের নির্ধারিত বিঘা-কাঠার রূপান্তর স্থানীয় প্রচলিত মাপ বা নির্দিষ্ট দলিলের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
আগে মারা যাওয়া সন্তানের পরিবারকে হিসাবের মধ্যে আনার ব্যবস্থা
অ্যাপটিতে একটি উল্লেখযোগ্য বিকল্প হলো মৃত ব্যক্তির জীবদ্দশায় তাঁর কোনো পুত্র বা কন্যা মারা গেলে সেই সন্তানের জীবিত ছেলেমেয়েদের যুক্ত করার সুযোগ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৪-এর কথা উল্লেখ করে এই হিসাবের বিকল্পটি প্রাথমিক অবস্থায় চালু রাখা হয়েছে।
নমুনা পরিবারেও আগে মারা যাওয়া এক পুত্র এবং তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ের তথ্য রয়েছে। সফটওয়্যার ওই মৃত পুত্রকে হিসাবের একটি শাখা হিসেবে ধরে তাঁর সন্তানদের অংশ দেখায়। এতে ব্যবহারকারী এমন একটি পারিবারিক পরিস্থিতি হিসাবের মধ্যে আনতে পারেন, যা শুধু জীবিত পুত্র-কন্যার সংখ্যা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।
তবে কোডে কোনো আইনের উল্লেখ থাকা মানেই জটিল উত্তরাধিকার বিরোধে তার ফলাফল চূড়ান্ত—এমন নয়। কার মৃত্যু আগে হয়েছে, কারা তখন জীবিত ছিলেন এবং একাধিক প্রজন্মের দাবি আছে কি না, এসব তথ্য ফল বদলে দিতে পারে। অ্যাপটি ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করে; মৃত্যুর ক্রম বা দাবির প্রমাণ পরীক্ষা করে না।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দায়ের তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে
সোর্স কোড অনুযায়ী, কাফন-দাফনের খরচ, ঋণ ও অনাদায়ী দেনমোহর মেটাতে অ্যাপটি আগে নগদ টাকা, তারপর ব্যাংকের অর্থ ধরে। এগুলো যথেষ্ট না হলে দেওয়া বাজারদরের ভিত্তিতে জমি ও স্বর্ণ থেকে দায় সমন্বয়ের একটি আনুপাতিক হিসাব দেখায়।
কিন্তু নগদ ও ব্যাংকের অর্থ কম, অথচ জমি বা স্বর্ণের দর দেওয়া হয়নি—এমন অবস্থায় সফটওয়্যার বাকি দায় পুরোপুরি সমন্বয় করতে পারে না। স্ক্রিনে সতর্কবার্তা দিলেও জমি বা স্বর্ণের অংশ বণ্টনের প্রতিবেদন দৃশ্যমান থাকতে পারে। ফলে কেউ সতর্কবার্তা এড়িয়ে শুধু ওয়ারিশদের অংশের টেবিল দেখলে প্রকৃত বণ্টনযোগ্য সম্পদ সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারেন।
ওসিয়তের ক্ষেত্রেও ব্যবহারকারী একটি শতকরা হার দেন; সফটওয়্যার সেটি সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমিত রাখে। কিন্তু ওসিয়ত কার জন্য, তা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—এ ধরনের বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা কোডে নেই।
শতভাগে হিসাব মেলা যথেষ্ট নয়
প্রতিবেদনে ওয়ারিশদের অংশের যোগফল ১০০ শতাংশ হয়েছে কি না, তা দেখায় ক্যালকুলেটর। হিসাবের অঙ্ক যাচাইয়ে এটি উপকারী। কিন্তু অঙ্ক মিলে গেলেই ওয়ারিশতালিকা পূর্ণ বা সম্পদের বিবরণ সঠিক—এ নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। কোনো ওয়ারিশ বাদ পড়লে কিংবা জমির পরিমাণ ভুল লেখা হলে সেই ভুল তথ্য নিয়েও একটি পরিপাটি, শতভাগে মেলা প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে।
আরও একটি ব্যবহারিক পার্থক্য রয়েছে: স্ক্রিনের পূর্ণ প্রতিবেদনে যে সতর্কবার্তাগুলো দেখা যায়, ‘রিপোর্ট কপি করুন’ সুবিধায় তৈরি লেখায় তার সবগুলো যায় না। তাই শুধু কপি করা হিসাব অন্যকে পাঠালে মূল প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা তাঁর চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
ব্যবহারকারীর লেখা তথ্য ব্রাউজারে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। এতে পরে একই ব্রাউজারে কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়, তবে পরিবারের নাম ও সম্পদের বিবরণ ব্যবহারের পর শেয়ার করা ডিভাইসে রেখে দেওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ক্যালকুলেটরটি পরিবারের সদস্যদের সামনে সম্পদ ও সম্ভাব্য অংশের একটি আলোচনাযোগ্য খসড়া হাজির করতে পারে। কিন্তু ঋণ পরিশোধ, পূর্ণ ওয়ারিশতালিকা, দলিল-খতিয়ানের তথ্য এবং জমির নির্দিষ্ট অংশের বাস্তব বণ্টন যাচাই ছাড়া সেই খসড়াকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অ্যাপটির নিজের সতর্কবার্তাতেও বলা আছে, এটি সহায়ক হিসাব—কোনো আইনি সনদ বা আদালতের রায় নয়।

