সরকারি নিউজ আপডেট

আয়কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব: বছরজুড়ে রিটার্ন দাখিল, আগে দিলে করছাড়, দেরিতে জরিমানা

আগামী অর্থবছর থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় করদাতারা বছরের যেকোনো সময় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে নির্ধারিত সময়ের শুরুতেই রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য করছাড় এবং দেরিতে জমা দিলে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা কমানো এবং স্বর্ণ, রৌপ্য, ডিজিটাল সম্পদসহ বিভিন্ন মূলধনি সম্পদ বিক্রির মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর (গেইন ট্যাক্স) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের করব্যবস্থায় নতুন একটি কাঠামো চালু হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বছরজুড়ে রিটার্ন জমার সুযোগ

বর্তমানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী করদাতারা পুরো অর্থবছরজুড়েই রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। তবে করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা ও জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাবে। তবে এই ছাড়ের সর্বোচ্চ সীমা হবে ২৫ হাজার টাকা

অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের পরে রিটার্ন জমা দিলে ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদ্ধতি করদাতাদের দ্রুত রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও আরও নিয়মিত হবে।

কমছে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত

প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের সুবিধাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্র, জীবনবিমা, ডিপিএসসহ বিভিন্ন অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত পাওয়া যায়।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই সুবিধা কমিয়ে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে কর রেয়াতের সুযোগ সীমিত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের কর-সাশ্রয়ী পরিকল্পনায় নতুন করে হিসাব করতে হবে। বিশেষ করে মধ্য ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।

স্বর্ণ ও ডিজিটাল সম্পদ বিক্রিতে ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স

বাজেট প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বর্ণালংকার, স্বর্ণের বার, রৌপ্য, মূল্যবান রত্ন, ধাতব মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, চিত্রকর্ম, এন্টিকস এবং ক্লাব সদস্যপদ হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্জিত আয়কে মূলধনি সম্পদ হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ।

এর আওতায় করদাতার আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত সম্পদ বিক্রি করে অর্জিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর (Capital Gain Tax) আরোপ করা হবে।

অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি স্বর্ণ বা অন্য কোনো অন্তর্ভুক্ত সম্পদ একটি নির্দিষ্ট মূল্যে কিনে পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রি করেন, তাহলে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে, কেউ যদি ৫ লাখ টাকায় স্বর্ণ কিনে পরে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে ২ লাখ টাকা মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে।

সাত ধরনের সেবায় বিআইএন বাধ্যতামূলক

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সাতটি নির্দিষ্ট সেবায় এই বিধান কার্যকর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সরকারের মতে, এর মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণ, লেনদেনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কেবল কর আদায়ের পদ্ধতিই বদলাবে না, বরং করদাতাদের আচরণেও প্রভাব ফেলবে। আগে রিটার্ন জমা দিলে করছাড় এবং দেরি করলে জরিমানার ব্যবস্থা করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করবে।

অন্যদিকে বিনিয়োগ রেয়াত কমানো ও মূলধনি সম্পদের মুনাফার ওপর কর আরোপের ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিনিয়োগ পরিবেশ ও সঞ্চয়ের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আয়কর ব্যবস্থায় একাধিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের কর প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *