বিয়ের সময় কাবিননামার বিভিন্ন শর্ত নিয়ে সাধারণত খুব বেশি আলোচনা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামটি খালি রাখা হয় অথবা বিষয়টি না বুঝেই সেখানে ‘না’ লেখা হয়। তবে আইনজ্ঞদের মতে, এই একটি কলাম ভবিষ্যতে একজন নারীর বৈবাহিক অধিকার ও বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি আইনজীবী খন্দকার জাবেদ জিলানীর একটি আইনি ব্যাখ্যা সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে তিনি কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের গুরুত্ব, এর আইনি প্রভাব এবং বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
১৮ নম্বর কলামে কী থাকে?
কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে মূলত উল্লেখ করা হয়, স্বামী তার তালাক প্রদানের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করছেন কি না এবং করলে কোন শর্তে তা করবেন। ইসলামী আইনে এই ব্যবস্থাকে ‘তালাক-ই-তাফওয়ীজ’ বা Delegated Divorce বলা হয়।
অর্থাৎ, স্বামী চাইলে বিবাহ চুক্তির অংশ হিসেবে স্ত্রীকে এমন ক্ষমতা দিতে পারেন, যার মাধ্যমে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে স্ত্রী নিজেই তালাক কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে পারেন।
‘হ্যাঁ’ লেখা থাকলে কী সুবিধা পান স্ত্রী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮ নম্বর কলামে স্বামীর সম্মতির ভিত্তিতে ক্ষমতা অর্পণ করা হলে স্ত্রী নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী তালাক-ই-তাফওয়ীজ প্রয়োগ করতে পারেন।
সাধারণত যেসব শর্ত উল্লেখ করা হতে পারে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে;
- দীর্ঘদিন ভরণপোষণ প্রদান না করা;
- শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন;
- অথবা কোনো শর্ত ছাড়াই ক্ষমতা অর্পণ।
এ ধরনের ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীর প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।
‘না’ লেখা থাকলে কি স্ত্রী তালাক দিতে পারবেন না?
আইনজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে ‘না’ লেখা থাকলে বা কলামটি খালি থাকলে স্ত্রী তালাক-ই-তাফওয়ীজের সুবিধা পান না। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার হারিয়ে ফেলেন।
এ ক্ষেত্রে একজন স্ত্রী—
- খোলা (Khula) চাইতে পারেন;
- Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939 অনুযায়ী আদালতে মামলা করতে পারেন;
- পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি নিতে পারেন।
অর্থাৎ, আইনগতভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের পথ তখনও খোলা থাকে।
আইন কি স্বামীকে এই ক্ষমতা দিতে বাধ্য করেছে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, Muslim Family Laws Ordinance, 1961 অনুযায়ী স্বামীকে বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিতে হবে—এমন কোনো বিধান নেই।
এটি সম্পূর্ণভাবে একটি চুক্তিভিত্তিক বিষয়। স্বামী চাইলে এই ক্ষমতা দিতে পারেন, শর্তসাপেক্ষে দিতে পারেন অথবা একেবারেই না-ও দিতে পারেন।
কলাম খালি থাকলে কী হবে?
সাধারণভাবে কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম খালি রাখা হলে বা ‘না’ লেখা থাকলে ধরে নেওয়া হয় যে স্বামী তার তালাক প্রদানের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করেননি। ফলে স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য খোলা অথবা আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।
তালাক-ই-তাফওয়ীজ প্রয়োগের প্রক্রিয়া কী?
অনেকের ধারণা, ১৮ নম্বর কলামে ক্ষমতা পাওয়া মানেই স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তালাক কার্যকর করতে পারবেন। তবে বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর বিধান অনুযায়ী স্ত্রী তালাক-ই-তাফওয়ীজ প্রয়োগ করলেও তাকে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশনের মেয়রকে লিখিত নোটিশ প্রদান;
- অপর পক্ষকে নোটিশ পাঠানো;
- ৯০ দিনের সালিশি বা পুনর্মিলন প্রচেষ্টা;
- নির্ধারিত সময় শেষে তালাক কার্যকর হওয়া।
ফলে ক্ষমতা অর্পণ থাকলেও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
১৮ ও ১৯ নম্বর কলামের মধ্যে পার্থক্য
অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ ও ১৯ নম্বর কলাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়।
১৮ নম্বর কলামে উল্লেখ থাকে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিচ্ছেন কি না।
অন্যদিকে ১৯ নম্বর কলামে উল্লেখ করা হয় স্বামীর নিজস্ব তালাক প্রদানের ক্ষমতার ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা বা শর্ত আরোপ করা হয়েছে কি না।
ফলে দুটি কলামের উদ্দেশ্য ও আইনি প্রভাব সম্পূর্ণ আলাদা।
সচেতনতার অভাবেই বাড়ছে বিভ্রান্তি
আইনবিদদের মতে, কাবিননামা শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ নয়; এটি একটি বৈধ ও কার্যকর চুক্তি। তাই এতে অন্তর্ভুক্ত শর্তাবলি আইন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী না হলে তা কার্যকর হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এ কারণে বিয়ের সময় কাবিননামার প্রতিটি ধারা ও কলাম মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং বুঝে স্বাক্ষর করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম স্ত্রীর জন্য একটি অতিরিক্ত ও চুক্তিভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। এই কলামে ক্ষমতা অর্পণ করা হলে স্ত্রী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তালাক-ই-তাফওয়ীজ প্রয়োগের সুযোগ পান। তবে এই ক্ষমতা না থাকলেও স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার হারান না; সেক্ষেত্রে তাকে খোলা বা আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার কাবিননামার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উপেক্ষা করে। অথচ ভবিষ্যতে বৈবাহিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
