নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয় হলো—প্রজ্ঞাপন বা গেজেট আসলে কখন এবং কীভাবে প্রকাশ হয়? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের পোস্ট, সম্ভাব্য তারিখ এবং ‘গেজেট হয়ে গেছে’ কিংবা ‘আজই প্রকাশ হচ্ছে’—এমন দাবিও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে অনেকের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি তথ্যে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়াকে মোটামুটি তিনটি ধাপে দেখানো হয়েছে—খসড়া প্রস্তুত ও অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং এরপর বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) থেকে প্রকাশ। বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ সত্যিই একটি আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে ধাপগুলোর ক্রম একই থাকবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গেজেট মানেই শুধু ছাপাখানায় ছাপা নয়
সরকারি গেজেট হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো আইন, বিধি, আদেশ, প্রজ্ঞাপন বা সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশের আনুষ্ঠানিক মাধ্যম। বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গেজেটের নিয়মিত ও অতিরিক্ত সংখ্যা প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত গেজেটও প্রকাশ করা হয়।
অর্থাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা খসড়া তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘গেজেট’ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর তা সরকারি গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয়।
১. প্রথম ধাপ—খসড়া প্রস্তুত ও অনুমোদন
কোনো নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত করতে হয়। সেখানে নতুন বেতন কাঠামোর গ্রেড, বেতনহার, কার্যকর হওয়ার তারিখ, বাস্তবায়নের শর্তসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হয়।
নবম জাতীয় পে-স্কেলের ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে—এরপর সেটিকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
২. আইনগত যাচাই বা ভেটিং
প্রজ্ঞাপনের ভাষা ও বিধান বিদ্যমান আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে ভেটিংয়ের জন্য খসড়া পাঠানো হয়।
সরকারি নথি ও বিভিন্ন সরকারি প্রকাশনার ক্ষেত্রেও আইনগত যাচাই শেষে তা প্রকাশের জন্য পাঠানোর নজির রয়েছে।
এ কারণে ‘ভেটিং হয়েছে’ এবং ‘গেজেট প্রকাশ হয়েছে’—এই দুটি বিষয় এক নয়। ভেটিং সম্পন্ন হওয়া মানে সংশ্লিষ্ট খসড়ার আইনগত যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে; এরপরও প্রকাশ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা থাকতে পারে।
৩. বিজি প্রেসের ভূমিকা কোথায়?
বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেস সরকারের গুরুত্বপূর্ণ গেজেট ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় মুদ্রণকাজ সম্পাদন করে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গেজেট প্রকাশ করা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—বিজি প্রেসে খসড়া পাঠানো আর গেজেট প্রকাশ হয়ে যাওয়া একই বিষয় নয়।
নবম পে-স্কেল নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছিল, খসড়া বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং আনুষ্ঠানিক এসআরও নম্বর পাওয়ার মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।
অর্থাৎ শুধু ‘খসড়া বিজি প্রেসে গেছে’—এই তথ্যকে ‘গেজেট প্রকাশ হয়ে গেছে’ হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয়।
৪. এসআরও নম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি প্রজ্ঞাপন বা সংশ্লিষ্ট আদেশ প্রকাশের ক্ষেত্রে নম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ শনাক্তকারী। নবম পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে আনুষ্ঠানিক এসআরও নম্বরসহ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি, স্ক্রিনশট বা ‘গেজেট হয়ে গেছে’ ধরনের পোস্ট দেখলেই সেটিকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে প্রজ্ঞাপনের সরকারি কপি, নম্বর ও প্রকাশের তারিখ যাচাই করা জরুরি।
৫. গেজেট প্রকাশের পর কী হয়?
গেজেট প্রকাশের পর সেটি আর শুধু ‘খসড়া’ বা ‘প্রক্রিয়াধীন’ কোনো নথি থাকে না; বরং আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রকাশনার অংশ হয়ে যায়। মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেজেট ওয়েবসাইট ও মুদ্রিত—দুই মাধ্যমেই প্রকাশ করা হয়।
এ ছাড়া সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতেও বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন ও গেজেটের কপি প্রকাশ করা হয়। আইন ও বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০০৯-২০২৬ সময়ের বিভিন্ন আইন ও গেজেটের কপি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
নবম পে-স্কেলের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি কী?
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে অর্থসচিবের বক্তব্য হিসেবে ৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারির লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে জানানো হয়েছিল, খসড়া বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
তবে ৫ সেপ্টেম্বরের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে থাকলেও ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথাও জানা গেছে।
এখানেই মূল বিষয়টি পরিষ্কার হয়: সম্ভাব্য প্রকাশের তারিখ আর প্রকৃত গেজেট প্রকাশের তারিখ এক জিনিস নয়।
সরকারি প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত কপি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট তারিখকে নিশ্চিত বলে প্রচার করা ঝুঁকিপূর্ণ।
‘গেজেট হয়ে গেছে’—দাবি যাচাই করবেন যেভাবে
কোনো পোস্টে গেজেট প্রকাশের দাবি দেখলে অন্তত পাঁচটি বিষয় মিলিয়ে দেখা উচিত—
১. সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপন আছে কি না
২. প্রজ্ঞাপন বা এসআরও নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে কি না
৩. প্রকাশের তারিখ স্পষ্ট কি না
৪. বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়/মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রকাশিত কপির সঙ্গে মিলছে কি না
৫. প্রজ্ঞাপনের পূর্ণাঙ্গ সরকারি PDF বা স্ক্যান কপি পাওয়া যাচ্ছে কি না
এসবের কোনোটি না থাকলে শুধু ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও বা কোনো ব্যক্তির বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে ‘গেজেট প্রকাশিত’ ঘোষণা করা উচিত নয়।
তাহলে ভাইরাল ছবিটির তথ্য কতটা সঠিক?
ছবিটিতে খসড়া → আইনগত ভেটিং → বিজি প্রেসে মুদ্রণ ও প্রকাশ—এমন একটি সাধারণ কাঠামো দেখানো হয়েছে। মূল ধারণাটি যে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি, আইনগত যাচাই এবং সরকারি মুদ্রণ/প্রকাশনার ধাপ রয়েছে—তা যৌক্তিক।
কিন্তু সব প্রজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে এই তিনটি ধাপ ঠিক একই ক্রমে এবং একইভাবে সম্পন্ন হবে—এমন সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে ছবিটিকে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে নবম পে-স্কেলের বর্তমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে খসড়া বিজি প্রেসে পাঠানো, সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আসা এবং এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও এসআরও নম্বর পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সুতরাং ‘খসড়া তৈরি হয়েছে’, ‘বিজি প্রেসে গেছে’, ‘ভেটিং হয়েছে’, ‘এসআরও নম্বর হয়েছে’ এবং ‘গেজেট প্রকাশিত হয়েছে’—প্রতিটি আলাদা মাইলফলক। একটিকে আরেকটির সমার্থক হিসেবে দেখলে ভুল তথ্য ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
শেষ কথা
নবম পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই গেজেট প্রকাশের আগ্রহ তুঙ্গে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন ধৈর্য এবং সরকারি উৎস থেকে তথ্য যাচাই।
কারণ, গেজেট প্রকাশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হলো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপনের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ—শুধু ‘হবে’, ‘হয়ে গেছে’, ‘বিজি প্রেসে গেছে’ কিংবা ‘আজ প্রকাশ হবে’ ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নয়।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়েছে এবং তা শেষ পর্যায়ের দিকে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে চূড়ান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য তারিখকে নিশ্চিত তারিখ হিসেবে প্রচার না করাই সবচেয়ে নিরাপদ।


